‘তাসাওফ’ বা সূফীবাদের বুনিয়াদ ও প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে নানা মতভেদ ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা চলে আসছে। তবে ত্বরীক্বতের নির্ভরযোগ্য ইমামগণ এবং মা’রিফাতপ্রাপ্ত বুযুর্গদের মধ্যে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে যে—। তাসাওফ মূলত নিজের দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য খাঁটি করে নেওয়ার নাম।অর্থাৎ বান্দা নিজের যাহির ও বাত্বিন— বাহ্যিক আমল ও অন্তরের অবস্থাকে— কুরআনের এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তর করবে—وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلّٰهِ“তারা তাদেরদ্বীনকেএকমাত্রআল্লাহরজন্যএকনিষ্ঠকরেছে।”তাসাওফের সর্বোচ্চ মূলনীতি হলো—খূদী ও খোদ-গরযী (আত্মগর্ব ও স্বার্থপরতা) সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা।একজন প্রকৃত সূফী কখনো নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করেন না। তিনি অহংকার ও আত্মদর্শন বর্জন করে মন, বাক্য ও সম্পদ দ্বারা মানবজাতির কল্যাণে নিয়োজিত থাকেন।অমুসলিম গবেষকরাও স্বীকার করেছেন যে, তাসাওফ হচ্ছে ‘ইলমে ইলাহী’ (আল্লাহ্ সম্পর্কিত জ্ঞান) ও ‘ইলমে রূহানী’ (আত্মিক জ্ঞান)-এরই অপর নাম। এই ধারার অনুসারীরা মানবজাতির মাঝে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকেন এবং মানুষের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও পারস্পরিক বিরোধ দূর করার উপায় অনুসন্ধান করেন, যাতে প্রত্যেকে সহজেই আত্মিক উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে।‘সূফী’ (صوفي) শব্দের উৎপত্তি : বিভিন্ন মত‘সূফী’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে বহু মত প্রচলিত রয়েছে। নিচে সেগুলো পর্যালোচনাসহ তুলে ধরা হলো—১. আসহাব-ই সুফ্ফাহ্থেকেউৎপত্তিকেউ কেউ বলেন, ‘সূফী’ শব্দটি আসহাব-ই সুফ্ফাহ্ (اصحاب صفه) থেকে গৃহীত। তাঁরা ছিলেন সেই সাহাবী-
গণ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম), যারা মসজিদে নববীতে অবস্থান করে ইবাদত, রিয়াযত ও জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। পর্যালোচনা:ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ‘সুফ্ফাহ্’ থেকে ‘সূফী’ হয় না; বরং ‘সাফাভী’ হওয়ার কথা। তাই এ মত প্রশ্নবিদ্ধ।২. ‘সফ্’ (صفّ) বা কাতার থেকে উৎপত্তিএই মত অনুযায়ী, সূফীগণ আল্লাহর নৈকট্যের প্রথম কাতারে অবস্থান করেন বলেই তাঁদের ‘সূফী’ বলা হয়।পর্যালোচনা:আভিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ‘সফ্’ থেকে ‘সূফী’ নয়, বরং ‘সফ্ফী’ হওয়া উচিত। তাই এ মতও গ্রহণযোগ্য নয়।৩. ‘সাফাভী’ থেকে রূপান্তরকেউ কেউ বলেন, শব্দটি মূলত ‘সাফাভী’ ছিল; দীর্ঘ ব্যবহারে তা ‘সূফী’ হয়েছে।৪. পশমী পোশাক (صوف) থেকেউৎপত্তি
এ মত অনুযায়ী, প্রাচীন সূফীগণ পশমী পোশাক পরিধান করতেন বলে তাঁদের ‘সূফী’ বলা হতো।পর্যালোচনা:
অনেক আলিম এ মতকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করেন না। কারণ সূফীদের মতে পশমী পোশাক পরা অপরিহার্য নয়।
এ বিষয়ে ইমাম কুশাইরী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর রিসালাহ্-ই কুশাইরিয়্যাহ্-এ স্পষ্টভাবে লিখেছেন—“পশমী পোশাক পরিধান সূফীদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নয়।”৫. গ্রীক শব্দ ‘সোফ’ থেকে উৎপত্তিকেউ কেউ বলেন, ‘সূফী’ শব্দটি গ্রীক ‘সোফ’ (হিকমত) থেকে এসেছে।পর্যালোচনা:
এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ ইসলামী সূফীগণের জীবন-
ব্যবস্থা ও চিন্তাধারা গ্রীক দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হাক্বীক্বত অনুধাবনের চারটি ধারা বস্তুজগতের বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে চিন্তাবিদদের চারটি ধারা রয়েছে—
১. সূফীগণনূর-ই নুবুওয়াত, রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ, রিয়াযত-মুজাহাদা ও সুস্থ বিবেকের মাধ্যমে হাক্বীক্বত উপলব্ধি করেন। এ পথের প্রতিষ্ঠাতা নবীগণ আলাইহিমুস সালাম।২. ইশরাক্বীগণব্যক্তিগত কাশ্ফ ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভরশীল। এ ধারার প্রবর্তক প্লেটো।
৩. মুতাকাল্লিমীনইলমে কালাম ও যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে আকীদা ব্যাখ্যা করেন।৪. মাশ্শা-ঈনদলিল ও বাহ্যিক প্রমাণের মাধ্যমে বাস্তবতা নির্ণয় করেন। এ ধারার প্রবর্তক এরিস্টটল।এ তুলনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সূফী ও গ্রীক দার্শনিকদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।‘সূফী’ ও ‘তাসাওফ’ নব-আবিষ্কৃত নয়কেউ কেউ দাবি করেন যে, ‘তাসাওফ’ ও ‘সূফী’ পরবর্তীকালের সৃষ্টি। এ দাবি ঐতিহাসিকভাবে ভুল।কারণ—ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দি থেকেই এ শব্দগুলোর ব্যবহার রয়েছে ইমাম হাসান বসরীরাহিমাহুল্লাহর যুগে ‘সূফী’ শব্দ প্রচলিত ছিল
বহু প্রাচীন গ্রন্থে এ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়অতএব, তাসাওফ কোনো নব আবিষ্কৃত মতবাদ নয়;বরংইসলামের আদি আত্মিক ধারারই বিস্তৃত রূপ। মাশাইখে কেরামের দৃষ্টিতে ‘সূফী’র সংজ্ঞাদাতা গঞ্জে বখ্শ রাহিমাহুল্লাহ বলেন—جو محبت كےذريعه صاف هوا وه صافى هوااور جومحبت حبيب ميں مستغرق هواوه غير محبوب سے برى هواوه صوفى هوگياঅর্থাৎ— যে ব্যক্তি ভালোবাসার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং আল্লাহর হাবীব (ﷺ)-এর মহব্বতে নিমজ্জিত হয়ে গায়রুল্লাহ থেকে মুক্ত হয়েছে, তিনিই প্রকৃত সূফী।হযরত জুনায়দ বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—তাসাওফ হলো বান্দার মানবীয় গুণাবলী ফানা করে আল্লাহ্ প্রদত্ত সিফাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।হযরত আবুল হাসান নূরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
সূফী তিনি, যিনি না কিছু অধিকার করেন, না কারো অধিকারভুক্ত হন।হযরত শিবলী রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
সূফী তিনি, যিনি উভয় জাহানে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কিছু দেখেন না। সব আলোচনার সারকথা হলো—
তাসাওফ ইসলামের আত্মিক পূর্ণতার পথ।আর যে ব্যক্তি ঈমান, ইখলাস, আমল ও আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে— তিনিই প্রকৃত অর্থে একজন খাঁটি সূফী।
আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সবাইকে খাঁটি তাসাওফ অনুসরণকারী, ইখলাসপূর্ণ মুমিন ও প্রকৃত সূফী বানানোর তাওফীক দান করুন।
আমীন।
সূফী ও সূফীবাদ (তাসাওফ)
