আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামের ঐতিহ্য, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তাশীল শিক্ষার এক অনন্য মিশ্রণ। এটি মিশরের কায়রোতে অবস্থিত এবং এর নামকরণের মূল উৎস হলো হজরত ফাতেমা (রা.)-এর উপাধি ‘আয-যাহরা’, যার অর্থ “উজ্জ্বল” বা “দীপ্তিমান”। মূলত একটি মসজিদ হিসেবে শুরু হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
ফাতেমীয় শাসনামল
৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আল-মুইজ মিশর জয়ের পর সেনাপতি জওহর আল-সিকিল্লি নতুন রাজধানী ‘আল-কাহিরা’ (কায়রো) প্রতিষ্ঠা করেন। ৯৭০-৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয় আল-আজহার মসজিদ। প্রথমে এটি কেবল ইবাদতের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং ছোট পরিসরে শিক্ষাও দেওয়া হতো। পরবর্তী কয়েক দশকে জ্ঞানী শিক্ষকরা এখানে যোগদানের ফলে এটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর শেষের দিকে বিখ্যাত আইনবিদ ইবনে কিলিস ও ইবনে নুমান এখানে শিক্ষকতা শুরু করলে আল-আজহারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।প্রারম্ভিক শিক্ষাক্রমে কুরআন, ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা, আরবি ব্যাকরণ, দর্শন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয় এবং খলিফা শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বৃত্তি চালু করেন।১০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি বিশালগবেষণালাইব্রেরি,যেখানে হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। পণ্ডিতদের জন্য বিনামূল্যে কাগজ, কলম ও কালি সরবরাহ করা হতো, যা শিক্ষাকে আরও সহজ ও উৎসাহব্যঞ্জক করেতুলেছিল।
আইয়ুবি শাসনামল
১১৬০-এর দশকের শেষভাগে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি ক্ষমতায় আসেন। ফাতেমীয়দের সময় আল-আজহার শিয়া মতাদর্শে পরিচালিত হতো,কিন্তু সালাউদ্দিন সুন্নি ছিলেন। তাই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সরকারি বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন। এই সময়ে লাইব্রেরিও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবু, তিনি কলেজ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে উচ্চশিক্ষায় অবদান রাখেন। এ ব্যবস্থায় মসজিদের আঙিনায় আলাদা শ্রেণিকক্ষ ও লাইব্রেরি স্থাপন করা হয় এবং ১২৫৮ সালে প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ আবদুল লতিফ শিক্ষকতা শুরুকরেন।
মামলুক শাসনামল
১২৬০-এর দশকে মামলুকরা ক্ষমতায় আসার পর আল-আজহার আবার সক্রিয় হয়। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি,শিক্ষকদের বেতন পুনঃপ্রবর্তন করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানকে অর্থওসম্পদ
দিয়ে সমৃদ্ধ করা হয়। ১৩৪০ সালে মসজিদেরপাশেএকট বিশাল কলেজ ভবন নির্মিত হয়। এই সময় শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি ব্যবস্থা করা হয়, বিশেষ করেঅন্ধবালক
দের জন্য। বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনওশিক্ষকতা শুরু করেন। ১৪০০-এর দশকের শেষের দিকে নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
অটোমান শাসনামল
১৫১৭ সালে অটোমানরা মিশর দখল করলে আল-আজহারে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়এসময়েবিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশ্ব
বিদ্যালয়ের প্রধান পদকে ‘শায়খুল আজহার’ বলা হয়। আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা খুব বেশি না হলেও, ১৭৪৮ সালে তুর্কি শাসক আহমেদ পাশা গণিত ওজ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ বাড়ানোর জন্য একটি সূর্যঘড়ি উপহার দেন।
ফরাসি শাসনামল
১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর আক্রমণের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার সূচনা হয়। ফরাসিদের আনানো মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মূল বই পড়ার সুযোগপায়। এ প্রভাবে ১৮৩০-এর দশকে ফরাসি ভাষা এবং আধুনিক বিষয় যেমন গণিত ও বিজ্ঞান পাঠ্যসূচিতে যুক্ত হয়।
আধুনিকায়ন ও বর্তমান
১৮৮২ সালে ব্রিটিশ শাসনকালে আল-আজহার আধুনিকায়িত হয়। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং চিকিৎসা ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। ১৮৮৫-১৯১৬ সালের মধ্যে প্রশাসনিক সংস্কার ও ছাত্র সংসদ গঠন করা হয়। গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ আবদুহ নিয়মিত পরীক্ষা ও নতুন কোর্স চালু করেন। ১৯৩৬ সালে আল-আজহার আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত হয়।
১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেন। ১৯৬১ সালে নারীদের উচ্চশিক্ষা চালু হয় এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়।বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮১টি অনুষদ ও ৩৬০
টিরও বেশি বিভাগ রয়েছে। ইসলামি শিক্ষারপাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখানো হয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ, যার একটি বড় অংশ বিদেশি। ১৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষক ও গবেষক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত। এভাবে আল-আজহার মুসলিম বিশ্বের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছরের জ্ঞানতীর্থ
