যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–এর মধ্যকার উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার ওপর যেকোনো সরাসরি আঘাতের জবাব তারা কঠোরভাবে দেবে। ইরানি নেতৃত্বের মতে, এমন আক্রমণ শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়াই ডেকে আনবে না, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও তা শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়বে।ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টার–এর বিশিষ্ট গবেষক বারবারা স্লাভিন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পথই নিরাপদ নয়। তাঁর ভাষায়, ইরানি শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে যে তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, তাহলে তারা এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।এদিকে তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরান ইস্যুতে তাঁর লক্ষ্য ‘জয়’ নিশ্চিত করা। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিকভাবে দৃঢ় ও দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সহজ কোনো বিজয় কৌশল নেই।বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র নীরব থাকবে না। এমন বক্তব্য তিনিএকাধিক
বার পুনরাবৃত্তি করেছেন এবং ইরানের জনগণকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন।তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব হুমকির পরও ইরানে দমন-পীড়ন বন্ধ হয়নি। বরং সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প হয়তো নিজেকে মানবিক হস্তক্ষেপের পক্ষের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন, কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
কূটনীতি ও সংঘাত নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট–এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকা-
রের সামরিক অভিযান চালাতে হলে পুরো শাসন
ব্যবস্থাকেই লক্ষ্য করতে হবে। কিন্তু এমন যুদ্ধ ইরানের জন্য না হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে
পারে।পারসির মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে তেলের দাম
বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপযুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে
পারে।অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ–এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নায়সান রাফাতি মনে করেন, অতীতে সীমিত হামলার জবাবে ইরান সংযত থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে তারা অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে এবার সামান্য হামলাও তেহরানকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত একটাই—ইরান ইস্যুতে শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে কম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো বিশ্ব ব্যবস্থায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে।