আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ইরান, চীন ও রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বিস্তৃত কৌশলগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেহরান, বেইজিং ও মস্কোর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে একটি উদীয়মান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।পূর্ববর্তী সহযোগিতার ধারাবাহিকতা
এই চুক্তি হঠাৎ করে আসেনি। গত কয়েক দশক ধরেই এই তিন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ধাপে ধাপে গভীর হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইরান ও রাশিয়া ২০ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি কার্যকর করে। এরও আগে, ২০২১ সাল থেকে ইরান ও চীন ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় কাজ করে আসছে।কেন এই চুক্তি ব্যতিক্রম আজকের চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো—এই প্রথমবারের মতো ইরান, চীন ও রাশিয়া একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে একত্র হয়েছে। এর ফলে পারমাণবিক অধিকার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সামরিক সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানে তারা ঘনিষ্ঠভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করবে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষায়, এই চুক্তি পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম স্বাধীনতা এবং একতরফা চাপ ও আধিপত্যের বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি আন্ত-
র্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি যৌথ অঙ্গীকার।চুক্তির প্রকৃতি
এটি ন্যাটোর মতো কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়। অর্থাৎ, এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো ধারা এতে নেই।বরং, এই উদ্যোগ পশ্চিমা সামরিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান।চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। ইরান, চীন ও রাশিয়া ইউরোপীয় দেশগুলোর ‘স্ন্যাপব্যাক’ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে আলোচনার অধ্যায় সমাপ্ত বলে ঘোষণা দিয়েছে।আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব
এই চুক্তি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কড়া অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছেন। এই
প্রেক্ষাপটে, নতুন এই কৌশলগত কাঠামো ইরানের জন্য সম্ভাব্য সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্যের সমর্থন ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান—বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া ও পারস্য উপসাগরে—আরও শক্তিশালী করতে পারে। অর্থনীতি
ও নিরাপত্তা সহযোগিতাচুক্তিটি পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা এবং ডলার-বহির্ভূত বাণিজ্য প্রসারের পথ খুলে দেবে। জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ ইরান চীন ও রাশিয়ার বিনিয়োগ এবং বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ পাবে।যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়, তবুওসামরিকসহযোগিতা,
প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত মহাসাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তিন দেশের যৌথ নৌ-মহড়া ইতোমধ্যেই এই ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে কী হতে পারেদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এই চুক্তি বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর পুনর্বিন্যাসকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বহু বছর ধরে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের যে ধারা চলছিল, ইরান–চীন–রাশিয়ার এই সমন্বয় তা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশ্ব রাজনীতি এখন আর শুধু পূর্ব ও পশ্চিমের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ক্রমশ একাধিক শক্তিকেন্দ্রভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।