অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন যে, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে সরকারের বাস্তব কার্যক্রমের সুস্পষ্ট অমিল রয়েছে। তাঁর মতে, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন—ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবাই এক ছাতার নিচে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেই “ছাতা” এখনো খোলা হয়নি; বৃষ্টি হচ্ছে, অথচ সুরক্ষার ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।
রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, গবেষক, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে ‘অঙ্গীকার থেকে অনুশীলন: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি—বাংলাদেশের নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, তাঁর মতে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে চলে এসেছে, কারণ সংস্কার ও বিচারমূলক উদ্যোগ নেওয়ার যে সুযোগ ছিল, সেই সক্ষমতা এখন প্রায় নিঃশেষ। সরকারের শক্তি ও উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। এখন সরকারের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো একটি গ্রহণযোগ্য ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন আয়োজন করা।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্রের বক্তব্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার বাস্তব চিত্র আড়াল করে। তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্য বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচারের শামিল।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারের একজন প্রভাবশালী বক্তা প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান যে, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর ৬৪৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস প্রশ্নবিদ্ধ।
তিনি বলেন, সরকারি হিসাবেই যখন এক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর সাড়ে ছয়শোর বেশি হামলার তথ্য উঠে আসে, তখন কেবল মন্দিরে হামলা বা প্রতিমা ভাঙাকেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতাকে সংকুচিত করে। জমি, ব্যবসা বা প্রতিবেশী বিরোধের আড়ালে এসব ঘটনাকে আলাদা করা হলেও, বাস্তবে এগুলো সংঘটিত হয়েছে ভুক্তভোগীরা সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেই।
তিনি একটি উদাহরণ টেনে বলেন, যেমন কোনো নারীর ওপর হামলার ক্ষেত্রে আমরা শুধু ‘একজন মানুষের ওপর হামলা’ বলেই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারি না; কারণ নারী হওয়ার কারণে তিনি বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। একইভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দুর্বল অবস্থানে থাকায় তাদের ওপর হামলার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অস্বীকার করা যায় না। তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনার বিচার না হওয়াটাও একটি গুরুতর সমস্যা।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, যখন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ তথ্য বিকৃতির রূপ নেয়, তখন সেই সরকারের প্রতি আস্থা ক্ষয় হয়, এবং তখনই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। তিনি বলেন, এই সংকটের মধ্য দিয়েই দেশকে নতুন উত্তরণের পথে এগোতে হবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে আরও স্পষ্ট ও প্রগতিশীল অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন ছিল। তবে যেসব অঙ্গীকার এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কঠোর নজরদারির আওতায় রাখতে হবে।
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, অতীতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখনো সেই ঘাটতি পূরণের সময় রয়েছে। নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
ভোটাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা ভোট বর্জনের মাধ্যমে মত প্রকাশের কথা বলেন, তারা বর্তমান বাস্তবতায় দেশের জন্য ইতিবাচক চিন্তা করছেন না। তাঁর মতে, ভোটই নাগরিকদের প্রকৃত শক্তি।
ভোটের সময় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি অন্তর্বর্তী সরকার একটি শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতাহীন নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তবে সেটিই হতে পারে তাদের শেষ ও সবচেয়ে ইতিবাচক অবদান, যা ইতিহাসে তাদের জন্য কিছুটা হলেও ইতিবাচক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।