আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি গোষ্ঠী তালেবান একটি নতুন ফৌজদারি আইন কার্যকর করেছে, যা পারিবারিক সহিংসতাকে কার্যত বৈধতা দেয় বলে মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই নতুন দণ্ডবিধিতে স্বাক্ষর করেছেন গোষ্ঠীটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।
প্রায় ৯০ পৃষ্ঠার এই আইন অনুযায়ী, স্বামীদের স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর শারীরিক শাস্তি প্রয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে মারধরের ফলে যদি হাড় ভেঙে যায় বা গুরুতর জখম হয়, সে ক্ষেত্রে স্বামীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাও আবার তখনই, যখন ভুক্তভোগী নারী আদালতে নির্যাতনের বিষয়টি প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম The Independent–এর তথ্য অনুযায়ী, পশতু ভাষায় রচিত এই দণ্ডবিধির নাম ‘দ্য মাহাকুমু জাজাই উসুলনামা’, যার অর্থ আদালতের ফৌজদারি বিধানসংক্রান্ত নিয়মাবলি। ইতোমধ্যে এটি আফগানিস্তানের বিভিন্ন আদালতে বিতরণ করা হয়েছে।
নতুন এই আইনে অপরাধ ও শাস্তির ক্ষেত্রে সামাজিক শ্রেণিভেদ স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সমাজকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—ধর্মীয় আলেম, অভিজাত শ্রেণি (আশরাফ), মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। একই ধরনের অপরাধ হলেও শাস্তির মাত্রা নির্ধারিত হবে অভিযুক্ত ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে।
আইন অনুযায়ী, কোনো ধর্মীয় আলেম অপরাধ করলে তার ক্ষেত্রে কেবল উপদেশই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। অভিজাত শ্রেণির কেউ অপরাধ করলে তাকে আদালতে ডেকে সতর্ক বা পরামর্শ দেওয়া হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অপরাধীদের জন্য রয়েছে কারাদণ্ডের বিধান। আর নিম্নবিত্ত শ্রেণির ব্যক্তিদের একই অপরাধের জন্য কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তিও দেওয়া হতে পারে।
এছাড়া বলা হয়েছে, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শারীরিক শাস্তি সংশোধনাগারে নয়, বরং ধর্মীয় আলেমদের তত্ত্বাবধানে প্রয়োগ করা হবে।
নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, বিবাহিত কোনো নারী স্বামীর অনুমতি ছাড়া আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে তার সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে গেলে নারীকে সম্পূর্ণ হিজাব পরিহিত অবস্থায় আদালতে হাজির হয়ে নিজের আঘাত প্রমাণ করতে হবে এবং এ সময় তার সঙ্গে স্বামী অথবা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অভিভাবকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
এই দণ্ডবিধি কার্যকর হওয়ার ফলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ আইন’ বাতিল হয়ে গেছে। আইনটি সে সময় আফগানিস্তানের যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের আমলে চালু হয়েছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নতুন এই আইন নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে মানুষ ভয় পাচ্ছে। কারণ তালেবান কর্তৃপক্ষ একটি নির্দেশনা জারি করে জানিয়েছে—এই দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।