যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগে থেকেই বাণিজ্য চুক্তি থাকা দেশগুলোকেও এখন নতুন এক বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। পূর্বনির্ধারিত দ্বিপাক্ষিক শুল্কহারের পরিবর্তে এসব দেশকে ১০ শতাংশ হারে সাধারণ আমদানি শুল্ক দিতে হবে। এই তালিকায় যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অংশীদার রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট তার আগের বেশ কিছু শুল্ক সিদ্ধান্ত বাতিল করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নতুন এই পদক্ষেপ নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি জানান, ওভাল অফিসে বসে স্বাক্ষর করা এই আদেশ প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
আদালতের রায়কে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, প্রশাসনের হাতে বিকল্প আইনি পথ রয়েছে এবং সেগুলো ব্যবহার করেই শুল্ক আরোপ অব্যাহত থাকবে। তার দাবি, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি রাজস্ব পাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে।
হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, সেকশন ১২২-এর আওতায় ১৫০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেই আপাতত ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে। এর ফলে আগে নির্ধারিত কিছু উচ্চ শুল্কহার কমে আসবে। যেমন—আগের চুক্তিতে জাপানের ওপর ১৫ শতাংশ এবং ভারতের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ ছিল, যা এখন ১০ শতাংশে নেমে আসবে।
প্রশাসনের আশা, বাণিজ্য আলোচনায় যেসব ছাড় বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা বজায় রাখবে।
সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির মধ্যে ছয়জন মত দেন যে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। এই রায় শুল্কবিরোধী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে ইতোমধ্যে পরিশোধ করা বিপুল অঙ্কের শুল্ক ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, অর্থ ফেরতের প্রশ্নে দীর্ঘ আইনি লড়াই হতে পারে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তিনি অন্যান্য আইনি ধারা ব্যবহার করে তার বাণিজ্যনীতি এগিয়ে নেবেন। তার মতে, এই শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করবে।
মূল বিরোধের কেন্দ্র ছিল বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক। শুরুতে মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে আরও বহু বাণিজ্য অংশীদারের ওপর তা সম্প্রসারণ করা হয়।
প্রশাসন ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংক্রান্ত একটি আইনের অধীনে এই শুল্ক আরোপকে বৈধ বলে দাবি করেছিল। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ওই আইনে সরাসরি ‘শুল্ক’ আরোপের কথা উল্লেখ নেই এবং কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন কর আরোপের ক্ষমতা দেয়নি।
আদালতের রায়ের পর ওয়াল স্ট্রিটে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিন শেষ করে।
নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কিছু পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়া হবে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কিছু কৃষিপণ্য যেমন কমলা ও গরুর মাংস, ওষুধসামগ্রী, কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু যানবাহন থাকতে পারে। ঠিক কোন পণ্য কতটুকু ছাড় পাবে, তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্যে আগের মতোই শুল্কছাড় বহাল থাকবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রয়োজনে প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা বা অন্যায্য বাণিজ্য চর্চার অভিযোগের ভিত্তিতে আরও কিছু আইনি ধারা ব্যবহার করতে পারে। অতীতে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ি খাতে শুল্ক আরোপে এমন ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল, এবং সাম্প্রতিক আদালতের রায়ে সেসব শুল্কে কোনো পরিবর্তন আসেনি।