ইরানকে ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, যাকে অনেকেই সম্ভাব্য যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত বলে মনে করছেন। তবে হোয়াইট হাউসের ভেতরেই এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রেসিডেন্টের কিছু উপদেষ্টা চান, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামরিক ইস্যুর বদলে অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক, কারণ এগুলোই ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ।
এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহব্যাপী সম্ভাব্য বিমান হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে চাইলে তার স্পষ্ট উদ্দেশ্য কী—সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কড়া অবস্থান নেওয়া হলেও প্রশাসনের ভেতরে এখনো ইরানে হামলার পক্ষে সর্বসম্মত সমর্থন তৈরি হয়নি। কিছু উপদেষ্টার আশঙ্কা, সামরিক উত্তেজনা বাড়লে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভোগা ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের আরেক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না। যদি ডেমোক্র্যাটরা এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে প্রেসিডেন্টের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রিপাবলিকান ঘরানার এক কৌশলবিদের মতে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তার ভাষ্য, ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে বিদেশে দীর্ঘ সময়ের সামরিক জড়িত থাকার বিপক্ষে। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এর আগে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে কড়া অবস্থান নিলেও, ইরান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় না এলে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তেহরানও কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুমকি দেয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট মূল্যস্ফীতি কমানো ও ব্যয়বহুল বিদেশি সংঘাত এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে ভোটারদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয়নি।
আরেক রিপাবলিকান কৌশলবিদের মতে, সামরিক পদক্ষেপ যদি সীমিত ও দ্রুত ফলদায়ক হয়, তাহলে সমর্থকদের একাংশ তা মেনে নিতে পারে। তবে যে কোনো সিদ্ধান্তকে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে স্পষ্টভাবে যুক্ত করতে হবে।
প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্য হামলার পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন। কখনও ইরানে অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ, আবার কখনও পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের দাবি কিংবা শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে বিমান হামলা কীভাবে এসব লক্ষ্য অর্জন করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসন কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা সে সক্ষমতা তৈরি থেকে বিরত রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।