মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রূপ নিচ্ছে। ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বাহরাইন, জর্ডান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা। অন্যদিকে ইসরায়েল ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রায় এক ডজনের বেশি দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিলেও “সবচেয়ে বড় আঘাত” এখনও বাকি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযান কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং প্রধান লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা।
পরাশক্তিদের অবস্থান
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য যৌথ বিবৃতিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়ে নিজেদের স্বার্থ ও মিত্রদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ন্যাটোও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, যদিও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, সংঘাতটি কেবল আঞ্চলিক নয়—বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে উদ্বেগ
মানামা, দোহা ও দুবাইয়ে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশের পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে উদ্বেগ বেড়েছে। এসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি পাল্টা আক্রমণে যাবে কিনা—তা নিয়ে তারা দোলাচলে রয়েছে। কারণ এমন সিদ্ধান্ত নিলে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য মিত্রতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইরান দাবি করেছে, তারা মূলত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকেই লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে বিভিন্ন দেশে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি
ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের পাল্টা হামলায় কাতার, ইসরায়েল, লেবানন, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
লেবাননের বৈরুত ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই অভিযান পরিচালনা করছে। ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
কুয়েতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা মিত্র বাহিনীর ভুলবশত গুলিবর্ষণের ফল বলে দাবি করা হয়েছে। জ্বালানি বাজারে প্রভাব
সংঘাতের জেরে কাতার ও সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিটেও প্রভাব পড়েছে; প্রধান সূচকগুলো নিম্নমুখী হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর শেয়ারের দামও বড় অঙ্কে কমেছে।
সামরিক অভিযানের লক্ষ্য
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা, নৌবাহিনী ও নিরাপত্তা অবকাঠামো দুর্বল করা। একইসঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে থামিয়ে দেওয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে স্থল হামলার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডকে “যুদ্ধ ঘোষণা” হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরান নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আলোচনার সম্ভাবনা?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও ইরানের পক্ষ থেকে তা নাকচ করা হয়েছে। তুরস্ক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘাতটি যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে না যায়, তবে তা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততায় বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সবই এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে।