বাংলাদেশের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে আগামী জুনের শেষ দিকে বা জুলাইয়ের শুরুতে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।
কর্মকর্তাদের মতে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ার পর মে ও জুন মাসে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সিনক্রোনাইজেশনের কাজ সম্পন্ন করা হবে। সবকিছু ঠিকভাবে এগোলে জুন বা জুলাইয়ের শুরুতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
প্রথমদিকে পরীক্ষামূলকভাবে অনিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়া হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে।
ফুয়েল লোডিং উদ্বোধনের প্রস্তুতি
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মার্চের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে। এ উপলক্ষে একটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারেন।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারেন বলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
উদ্বোধনের নির্দিষ্ট তারিখ বাংলাদেশ ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
টেস্টিং ও গ্রিড সংযোগ প্রক্রিয়া
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মার্চের শেষের দিকে প্রথম ইউনিট ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। তবে আন্তর্জাতিক অতিথিদের অংশগ্রহণের বিষয় বিবেচনায় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করা হতে পারে।
জ্বালানি লোডিং শেষ হতে প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে রিয়্যাক্টরের ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। তাই জুনের শেষ সপ্তাহ বা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বা প্রযুক্তিগত কারণে সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে
প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমবার চালু হলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এরপর প্রতি মাসে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ১,১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। আর পূর্ণ সক্ষমতায় ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে সময় লাগতে পারে প্রায় ৮ থেকে ১০ মাস।
এছাড়া এ বছরের শেষের দিকে দ্বিতীয় ইউনিটেও জ্বালানি লোডিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তা পরীক্ষায় গুরুত্ব
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ ‘হট রান’ ও ‘কোল্ড রান’ পরীক্ষাগুলো ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পটি চূড়ান্ত পরিদর্শন পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বড় কোনো নিরাপত্তা সমস্যা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তির প্রকল্প হওয়ায় প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়ের বাইরে অতিরিক্ত পরীক্ষা চালানো হতে পারে, যাতে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি না থাকে।
প্রকল্পে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি গত কয়েক বছরে একাধিকবার বিলম্বের মুখে পড়ে। করোনা মহামারি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলার সংকট প্রকল্পের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছে।
২০১৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃসরকারি চুক্তির মাধ্যমে এই প্রকল্প শুরু হয়। ২০১৭ সালে প্রথম ইউনিটের চুল্লির মূল কাঠামোর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়।
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। পরে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী তা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত চলবে এবং পুরো প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।