দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস ধরে নিম্নমুখী থাকার পর ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দামে আবারও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে গম, ভোজ্যতেল এবং বিভিন্ন ধরনের মাংসের দামের বৃদ্ধি বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচককে উপরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিঘ্ন ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এফএও নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রধান খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ফুড প্রাইস ইনডেক্স প্রকাশ করে থাকে। এই সূচকের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের গড় মূল্য প্রায় ০.৯ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি জানায়, এই পরিসংখ্যান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার আগের বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তবে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ, জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে।
ভোজ্যতেলের বাজারে বড় উল্লম্ফন
ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে ভোজ্যতেলের বাজারে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ৩.৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের জুন মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কমে যাওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে সয়াবিন তেলের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জৈব জ্বালানি নীতির সম্প্রসারণ সয়াবিন তেলের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে বাজারে এর দাম বেড়েছে। তবে অন্যদিকে আর্জেন্টিনা থেকে রপ্তানি বাড়ায় সূর্যমুখী তেলের দামে কিছুটা স্থিতি দেখা গেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সামান্য হ্রাসও হয়েছে।
গম ও চালের দামও বেড়েছে
ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দামও বেড়েছে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির তুলনায় গমের দাম প্রায় ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে তীব্র শীতের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতার কারণে বিশ্ববাজারে গমের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা বেশি থাকায় বাসমতি চালের দামেও সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এর দাম জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ০.৪ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে এফএও।
মাংসের বাজারেও মূল্য বৃদ্ধি
বৈশ্বিক বাজারে মাংসের দামও ফেব্রুয়ারি মাসে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এফএওর হিসাবে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মাংসের গড় দাম প্রায় ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে ভেড়ার মাংসের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের চাহিদা বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে শূকর এবং পোলট্রি মাংসের দামেও সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
দুগ্ধজাত পণ্য ও চিনির দামে স্বস্তি
তবে সব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়েনি। এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ১.২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দামও কমে প্রায় ৪.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে এসব পণ্যের দামে এই পতন দেখা গেছে।
বিশ্বে ৪১টি দেশে খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন
এফএওর পৃথক এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪১টি দেশে খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। এর অধিকাংশ দেশ আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত।
সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব দেশে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের প্রায় ৪৪টি দেশে ২০২৫–২৬ মৌসুমে শস্য উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে এফএও।