মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত সপ্তম দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলার দাবি করেছে তেহরান। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে আঘাত হানার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় এবং ইরান একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করে। উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত কয়েকটি দেশের আকাশসীমা ও সামরিক স্থাপনাকে ঘিরে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কুয়েত উপকূলে তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি
ইরানের সামরিক বাহিনীর একটি ইউনিট ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ দাবি করেছে, কুয়েতের উপকূলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ইউনিটটির এক মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, হামলার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়।
ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারিও বলেছেন, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর জাহাজটি আগুনে জ্বলতে দেখা গেছে। তবে এ ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তিন দেশে মার্কিন রাডার লক্ষ্য করে হামলার দাবি
ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, আমিরাত ও জর্ডানে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কাতারে স্থাপিত ‘এফপিএস-১৩২’ রাডার লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে।
এই রাডারটি দূরপাল্লার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ পায়নি।
কুয়েত সিটিতে বিস্ফোরণ ও ড্রোন হামলার দাবি
কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে।
এদিকে ইরান দাবি করেছে, কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে কয়েক ঘণ্টা ধরে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার ফলে মার্কিন বাহিনীর স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
খবর অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে সংঘটিত হামলাগুলোর মধ্যে কুয়েতে অন্তত ৬৭ জন সেনা আহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
বাহরাইনের রাজধানীতে বিস্ফোরণ
উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনের রাজধানী মানামাতেও কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি হোটেল ও দুটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
এর মধ্যে একটি ভবনে আগুন লাগলেও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ভবনগুলোর একটি স্থাপনায় কাতারের নৌবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তবে তারা সবাই নিরাপদে আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগের দিনও বাহরাইনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির প্রধান রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারে আগুন লাগার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
ইরাকের এরবিলে বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণ
ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর এরবিলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং আকাশে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।
এই এলাকায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর সেনারা অবস্থান করছে। একই সঙ্গে শহরটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় কনস্যুলেট কমপ্লেক্সও রয়েছে, যা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত আকার নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বিভিন্ন দেশে সামরিক স্থাপনা, তেল স্থাপনা এবং কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার খবর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।