রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর ইউক্রেনের যুদ্ধ ধীরে ধীরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে আকাশে গোয়েন্দা ও আক্রমণাত্মক ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরে চালকবিহীন নৌযান ব্যবহার করে রাশিয়ার নৌবাহিনীর ওপরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা হয়েছে।
শুধু আকাশ বা সমুদ্রেই নয়, স্থলযুদ্ধেও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। ইউক্রেন এখন বড় আকারে সশস্ত্র রোবট বা চালকবিহীন স্থলযান ব্যবহার শুরু করেছে। রাশিয়াও এর আগে থেকেই এ ধরনের প্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে।
এই চালকবিহীন স্থলযানগুলোকে বলা হয় ইউজিভি (Unmanned Ground Vehicle)। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী এগুলোকে “গ্রাউন্ড রোবট সিস্টেম” নামে উল্লেখ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই রোবটগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সহায়তা করছে। রুশ হামলা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কিছু ঘটনায় শত্রুপক্ষের সেনাদের আটক করার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। এমনও দাবি রয়েছে, কিছু পরিস্থিতিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার রোবট একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়েছে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি ছিল না।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কে–২ ব্রিগেডের সদস্য ওলেক্সান্দর আফানাসিয়েভ বলেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার ইতোমধ্যে বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। তার দাবি, তিনি বিশ্বের প্রথম ইউজিভি ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এই ইউনিটের রোবটগুলোতে কালাশনিকভ ধরনের মেশিনগান বসানো হয়েছে। আফানাসিয়েভ জানান, যে জায়গায় পদাতিক সৈন্য পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে এসব রোবট গুলি চালাতে পারে। প্রয়োজনে একটি ইউজিভি নিজের ধ্বংসের ঝুঁকি নিয়েও অভিযান চালাতে সক্ষম।
তার ইউনিট বিস্ফোরক বহনকারী ব্যাটারি চালিত ‘কামিকাজে’ ধরনের ইউজিভিও ব্যবহার করছে। এগুলো শত্রুর ঘাঁটি বা অবস্থানে আঘাত হানার জন্য পাঠানো হয়। আকাশে উড়ন্ত ড্রোনের মতো শব্দ না থাকায় এসব স্থল রোবট অনেক সময় হামলার আগে শত্রুকে সতর্ক হওয়ার সুযোগও দেয় না।
৩৩তম স্বতন্ত্র মেকানাইজড ব্রিগেডের ট্যাংক ব্যাটালিয়নের এক উপকমান্ডার, যার কলসাইন ‘আফগান’, জানান যে একটি মেশিনগান-সজ্জিত ইউক্রেনীয় ইউজিভি হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে একটি রুশ সৈন্যবাহী যান ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। আরেকটি রোবট কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি অবস্থান পাহারা দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এসব প্রযুক্তির এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিষয়টি মাথায় রেখে রোবটগুলোর স্বায়ত্তশাসন সীমিত রাখা হয়েছে।
বর্তমান প্রযুক্তিতে অনেক ইউজিভি আংশিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে এবং শত্রুর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু গুলি চালানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনও মানুষের হাতেই থাকে। কারণ ভুলবশত কোনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
সাধারণত নিরাপদ দূরত্বে থাকা অপারেটররা ইন্টারনেট বা যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব রোবট পরিচালনা করেন।
ইউক্রেনের তৈরি অনেক ইউজিভিতে মেশিনগানের পাশাপাশি গ্রেনেড লঞ্চারও লাগানো যায়। এগুলো ল্যান্ডমাইন স্থাপন, কাঁটাতারের বাধা তৈরি করা কিংবা বিভিন্ন প্রকৌশল কাজে ব্যবহৃত হয়।
তবে বাস্তবে এখনো অধিকাংশ চালকবিহীন স্থলযান সরঞ্জাম পরিবহন, রসদ পৌঁছে দেওয়া বা আহত সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়ার মতো সহায়ক কাজেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে দেশটির রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি মনে করেন, ভবিষ্যতে সশস্ত্র ইউজিভির ভূমিকা আরও দ্রুত বাড়বে।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে আক্রমণাত্মক ইউজিভি শুধু এককভাবে নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত বড় ড্রোন ঝাঁকের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তার মতে, অদূর ভবিষ্যতে আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে একসঙ্গে শত শত সস্তা কিন্তু উন্নত ড্রোন হামলা চালাতে পারে।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পেছনে একটি বড় কারণ হলো যুদ্ধক্ষেত্রে ঝুঁকি বৃদ্ধি। আকাশে ড্রোন নজরদারি বাড়ার ফলে সৈন্যদের অবস্থান সহজেই শনাক্ত করা যায়। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ইউক্রেনের তথাকথিত ‘কিল জোন’ যোগাযোগরেখা থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
আফানাসিয়েভের মতে, রোবট কখনোই পুরোপুরি পদাতিক বাহিনীর বিকল্প হতে পারবে না। তবে সৈন্যদের সহায়তায় এগুলোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে, কিন্তু প্রশিক্ষিত সৈন্য হারানোর ঝুঁকি নিতে চায় না।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী বর্তমানে জনবল সংকটে ভুগছে এবং নিহত সৈন্যদের পরিবর্তে নতুন সদস্য সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও নিজেদের ইউজিভি প্রযুক্তি উন্নত করছে। রুশ সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, তাদের তৈরি কিছু যান ফ্লেমথ্রোয়ার বা ট্যাংকে ব্যবহৃত ভারী মেশিনগান বহন করতে পারে এবং প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম।
রাশিয়ার সেনাবাহিনী ‘লিয়াগুশকা’ বা ‘ব্যাঙ’ নামে পরিচিত একটি চালকবিহীন যানও ব্যবহার করছে, যা ইউক্রেনীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে আক্রমণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় ইউজিভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডেভড্রয়েডের প্রধান নির্বাহী ইউরি পোরিতস্কি মনে করেন, খুব শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষের রোবট সরাসরি একে অপরের মুখোমুখি হবে।
তার কোম্পানি গত বছর ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর জন্য শত শত ‘স্ট্রাইক ড্রয়েড’ তৈরি করেছে।
পোরিতস্কির মতে, রোবট যুদ্ধ শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো মনে হলেও বাস্তবে এটি ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রের অংশ হয়ে গেছে।
বর্তমানে তারা এমন প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে রোবটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারে।
ভবিষ্যতে এসব রোবটকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে তারা নির্দিষ্ট এলাকায় গিয়ে নজরদারি বা অভিযান চালিয়ে নির্ধারিত সময় শেষে ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
ইউক্রেনের আরেক ইউজিভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেনকোর পরিচালক মাকসিম ভাসিলচেঙ্কো জানান, ২০২৫ সালে তাদের কোম্পানি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর জন্য দুই হাজারের বেশি ইউজিভি তৈরি করেছে।
তার ধারণা, ২০২৬ সালে এই চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার ইউনিটে পৌঁছাতে পারে, যার অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হবে অস্ত্রসজ্জিত।
ভাসিলচেঙ্কোর মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে স্ট্রাইক ড্রোন ও ইউজিভি অপরিহার্য হয়ে উঠবে। তিনি আরও মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষের আকৃতির রোবটও যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিতে পারে—যা একসময় কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও বাস্তবে রূপ নিতে পারে।