মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় প্রায় তিন হাজার পাঁচশোর বেশি বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রী (মুতামির) আটকা পড়েছেন। অনেকের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় দেশে ফেরার উপায় নেই। একই সময়ে, অনেকের প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ট্রাভেল এজেন্সিগুলো থাকার ও খাওয়ার খরচ আর বহন করছে না। নতুন করে দেশে ফেরার জন্য টিকিট কাটতে হলে প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে তারা চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শুক্রবার বিকেলে সৌদি আরবে পৌঁছানো দুই বাংলাদেশি মুতামির—রাজশাহীর মো. আজাদ এবং মুন্সীগঞ্জের রিয়াজুল হায়দার—ও দেশে ফেরার কথা ছিল শনিবার। তবে এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা দেশে ফিরতে পারেননি। হাতে টাকা নেই, নতুন টিকিটও নেই। ট্রাভেল এজেন্সি তাদের নতুন টিকিটের জন্য ৫০-৬০ হাজার টাকা দাবি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য তারা মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনে গিয়ে মিশনপ্রধান কনসাল কামরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেছেন। মিশন কর্মকর্তারা অভিযোগ শোনার পর সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দরিদ্র মুতামিরদের জন্য কিছু সাহায্যের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ এয়ারলাইন্স হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ করেছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালন করতে আসা যাত্রীদের প্রায় সবাই আটকা পড়েছেন। তিনি জানান, অনেক মুতামিরের টিকিট বাতিল হয়ে গেছে, এবং নতুন টিকিটের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে বলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “অনেক যাত্রী হোটেলের বিলও দিতে পারছেন না। খাবারের খরচও নেই। তাই তারা প্রতিদিন হজ মিশনে অভিযোগ জানাচ্ছেন। আমরা ট্রাভেল এজেন্সির মালিকদের সঙ্গে কথা বলছি এবং কিছু সহযোগিতার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
সূত্র জানায়, ফ্লাইট বা টিকিট বাতিল হলে সাধারণত এয়ারলাইন্স টাকা ফেরত দেয়, তবে এটি সময়সাপেক্ষ। তাই আপাতত আটকা পড়া যাত্রীদের নতুন টিকিট কেটে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। যেসব এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সচল, সেগুলোর ক্ষেত্রে নতুন টিকিটের প্রয়োজন নেই।
রাজশাহীর মুতামির মো. আজাদ বলেন, তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকার খরচে ২২ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করতে গিয়েছিলেন। দেশে ফেরার কথা ছিল ৭ মার্চ, কিন্তু যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। “এখন নতুন টিকিটের জন্য ৫০ হাজার টাকা চাইছে। আমি গরিব মানুষ, এত টাকা কোথা থেকে আনব?” তিনি বলেন।
আরেক মুতামির রিয়াজুল হায়দার জানান, তিনি এক সপ্তাহ ধরে নিজ খরচে হোটেলে থাকা-খাওয়া করছেন। তারা দেশে ফেরার জন্য ইন্ডিগো এয়ার-এর মাধ্যমে কলকাতা হয়ে ফেরার চেষ্টা করছেন।
গত শনিবার মক্কার মিশফালাহ এলাকায় দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের মো. দিদার, সাইফুল হক ও ছিদ্দিক আহমদসহ কয়েকজন মুতামির সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা জানান, প্রত্যেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্যাকেজে ওমরাহ করতে এসেছেন। তাদের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এক সপ্তাহ ধরে নিজেদের খরচে থাকার ও খাওয়ার ব্যয় বহন করতে হয়েছে। হোটেল ভাড়া দৈনিক প্রায় ৪০০ রিয়াল, সাথে খাবারের খরচ।
সূত্র জানায়, আগের টিকিট বাতিল হওয়ায় অনেককে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে নতুন টিকিট কিনতে হচ্ছে। প্রায় তিন হাজার পাঁচশো যাত্রীর জন্য এটি প্রায় ১৮ কোটি টাকা খরচের সমান।
বাংলাদেশ হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম জানান, আটকা পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে দুটি বিশেষ ফ্লাইট চালানোর অনুমতি নেওয়া হয়। কিন্তু খালি উড়োজাহাজে খরচ বেশি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। বর্তমানে যেসব নিয়মিত ফ্লাইট সচল, তাদের খালি থাকা টিকিট ৫০-৬০ হাজার টাকায় কিনে পর্যায়ক্রমে আটকা পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরানো হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ওমরাহ যাত্রীদের ওপরও। অনেক বাংলাদেশি এখন মক্কা ও মদিনা থেকে কলকাতার মাধ্যমে ইন্ডিগো এয়ার দিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রামে ফিরছেন।