মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বেড়েছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মে মাসের তেলের আগাম চুক্তির মূল্য ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে এশিয়ার বাজারে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের আগাম মূল্যও প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০৩ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। চলতি মাসে তেলের এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি একটি নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। সোমবার জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ কমেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার সূচক কমেছে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের ক্ষেত্রে তার প্রথম পছন্দ হতে পারে দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তেল খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেড়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ ইরানের ক্ষেত্রেও নেওয়া হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি চাপের জবাবে ইরান প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং জ্বালানি অবকাঠামো বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের দামে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক মাধ্যমে জানান, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এতে করে সংঘাতের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষক এড ইয়ারদেনি মনে করেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। তার মতে, তেলের উচ্চ মূল্য ও সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দার ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ এই পথ দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন করা হয়।
অন্যদিকে কৌশলবিদ ডেভিড রোচ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে স্থলবাহিনী মোতায়েন বা ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা। উল্লেখ্য, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল এই দ্বীপ দিয়েই রপ্তানি হয়।
তবে তিনি সতর্ক করেন, এমন পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার শিকার হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে।
এছাড়া সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরে পৌঁছায়। কিন্তু বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও রপ্তানি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহার করা হলেও পরিবহনের সক্ষমতা অনেকটাই কমে যাবে। এর ফলে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ থেকে হারিয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।
যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি: বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম, এশিয়ায় শেয়ারে দরপতন
