এক দশক আগে চীন ইরানের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানি করত, কিন্তু বর্তমানে তারা প্রায় সম্পূর্ণ তেলই কিনে নিচ্ছে।
চীনের ঝৌশান বন্দরে ইরান থেকে আসা অপরিশোধিত তেলবাহী একটি ট্যাংকারকে টাগবোটের সহায়তায় নোঙর করানো হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দেশটির তেল সরিয়ে দেওয়া এবং তেহরানের প্রধান আয়ের উৎস বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন—ইরান এখনো প্রতি মাসে কয়েক বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রি করছে। এ ক্ষেত্রে তারা একটি দেশের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল, সেটি হলো চীন।
নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর হয়েছে, ততই এই এশীয় অংশীদার ইরান থেকে তেল আমদানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। আগে যেখানে চীন ইরানের মোট তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কিনত, এখন তারা প্রায় পুরো উৎপাদনই নিচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য চালু রাখতে চীনা ক্রেতারা ইরানের সঙ্গে মিলে বিশ্বের অন্যতম বড় ‘নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলেছে। তেলের মূল্য পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে চীনের ছোট ব্যাংকগুলো, যাদের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সীমিত। ফলে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকলেও তাদের বড় ক্ষতির আশঙ্কা কম, এবং তাদের থামানোও কঠিন।
হংকংসহ বিভিন্ন স্থানে ইরানের গড়ে তোলা একাধিক ‘ফ্রন্ট কোম্পানি’ বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান এই আর্থিক লেনদেন সহজ করতে ভূমিকা রাখছে।
ওয়াশিংটনের চাপ এড়াতে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলো বাজার থেকে সরে দাঁড়ালেও, দেশটির ‘টিপট’ নামে পরিচিত ছোট বেসরকারি শোধনাগারগুলো এখন ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা। এই বাণিজ্য গোপন রাখতে প্রায়ই ভুয়া নথি ব্যবহার করা হয় এবং তেলের উৎস সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক Foundation for Defense of Democracies-এর বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স মেইজলিশের মতে, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রে চীনই ইরানের প্রধান সহযোগী। তার মতে, চীনের দীর্ঘদিনের এই সমর্থন না থাকলে ইরানের পক্ষে বর্তমান সংঘাত চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতো।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা একতরফা ও ‘অযৌক্তিক’ নিষেধাজ্ঞার বিরোধী। নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে একই সঙ্গে বেইজিং চেষ্টা করে যেন সরাসরি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে না পড়ে।
তবুও চীন ইরানি তেলের আকর্ষণ এড়াতে পারেনি। নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং তুলনামূলক কম দামে তেল পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা এই বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে সরাসরি চীনকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কারণ এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পরও এই নেটওয়ার্ক সচল রয়েছে। যদিও তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং পশ্চিমা জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে, তবুও ইরানের ট্যাংকারগুলো নিয়মিত চীনের দিকে যাচ্ছে।
চীনের সরকারি শুল্ক তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে ইরান থেকে তেল আমদানির কোনো রেকর্ড নেই। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান Kpler-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে, যা ইরানের মোট রপ্তানির বড় অংশ।
২০১৭ সালে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি শুরুর আগে চীন প্রতিদিন প্রায় ৬.৫ লাখ ব্যারেল তেল কিনত, যা এখন দ্বিগুণেরও বেশি।
সর্বোচ্চ চাপ
একসময় নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকায় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো সরাসরি ইরান থেকে তেল কিনত। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির পর ভারত, ইতালি ও গ্রিসসহ অনেক দেশই ইরানি তেল আমদানি বাড়ায়।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি বাতিল করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। ফলে ২০১৮ সালে যেখানে ইরানের তেল রপ্তানি ছিল দৈনিক প্রায় ২৮ লাখ ব্যারেল, ২০১৯ সালে তা কমে মাত্র ২ লাখে নেমে আসে।
তবে চীনের সহায়তায় ইরান দ্রুত নতুন কৌশল নেয়। ‘সাহারা থান্ডার’ ও ‘সেপেহর এনার্জি’র মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তেলের উৎস পরিবর্তন করে দেখানো হয় এবং ভুয়া নথি ব্যবহার করা হয়।
‘শ্যাডো ফ্লিট’ ও গোপন পরিবহন
এই গোপন বাণিজ্যে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্যাংকারগুলো নাম পরিবর্তন, ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা এবং মাঝসমুদ্রে তেল স্থানান্তরের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে উৎস গোপন করে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান C4ADS-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি চীনভিত্তিক নেটওয়ার্ক ৫৬টির বেশি জাহাজ দিয়ে কোটি কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করেছে।
‘টিপট’ শোধনাগারের ভূমিকা
চীনের ছোট বেসরকারি শোধনাগারগুলো—যাদের ‘টিপট’ বলা হয়—এই তেলের প্রধান ক্রেতা। তারা ডলারের বদলে ইউয়ানে লেনদেন করে, ফলে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি কমে যায়।
অর্থের প্রবাহ
লেনদেন সহজ করতে চীনের ছোট ব্যাংকগুলো ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে Bank of Kunlun উল্লেখযোগ্য, যা ইরানের সঙ্গে লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জটিল লেনদেন ব্যবস্থা
মার্কিন অভিযোগ অনুযায়ী, এই বাণিজ্যে ফ্রন্ট কোম্পানি, ভুয়া জাহাজ পরিচয় এবং সমুদ্রপথে তেল স্থানান্তরের মতো জটিল পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি অর্থ লেনদেন না করে পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যমেও হিসাব মেটানো হয়। অবকাঠামো নির্মাণের বিনিময়ে তেলের মূল্য পরিশোধ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই পদ্ধতিতে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।