মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে শুধু নিত্যপণ্যের বাজারই নয়, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রেও তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় কাঁচামাল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ব্যথানাশক থেকে শুরু করে জটিল রোগের ওষুধ—সবকিছুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের জন্য এক গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ওষুধ শিল্প মূলত পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক, আর এই পেট্রোকেমিক্যাল উপাদানগুলো জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং ওষুধ উৎপাদনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এসব কাঁচামালের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ওষুধ শিল্পের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার সরাসরি প্রভাব উৎপাদন ব্যয়ের ওপর পড়ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
অন্যদিকে পরিবহণ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাও এখন বড় সংকটে পড়েছে। আধুনিক ওষুধ শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করে কোল্ড চেইন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সমুদ্র ও আকাশপথে পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় এই ব্যবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে টিকা ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পরিবহণে আকাশপথ অপরিহার্য হলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যা সরাসরি ওষুধের বাজারমূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশ ওষুধ উৎপাদনে এগিয়ে থাকলেও তারা কাঁচামালের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে এসব দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ওষুধের মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে, যার ফলে বাড়তি দামে ওষুধ কিনতে না পেরে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো দেশেও ওষুধের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্যারাসিটামলসহ সাধারণ জ্বর ও ব্যথার ওষুধের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। খুচরা বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় তারা আগের দামে বিক্রি চালিয়ে যেতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওষুধের মূল্য ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।