পশ্চিমবঙ্গে গবাদিপশু জবাই ও গরু বাণিজ্যকে ঘিরে নজিরবিহীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলার ইতিহাসে এই প্রথম মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে গরু কোরবানির বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে কট্টর হিন্দু সমর্থক গোষ্ঠীর একটি অংশ যেকোনোভাবে গরু কোরবানি অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সোশ্যাল মিডিয়া গরু সংক্রান্ত ভিডিও ও বিতর্কে সয়লাব হয়ে গেছে। ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, মুসলিম যুবকেরা হিন্দু গরু বিক্রেতাদের গরু বিক্রি না করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে বলছেন। তাদের বক্তব্য, “নিজের মাকে কেন বিক্রি করবেন? তাকে বাড়ি নিয়ে সেবা করুন। আপনারা গরু বিক্রি করে লাভ করবেন আর আমরা জেলে যাব।” অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গবাদিপশু বহনকারী ট্রাক থামিয়ে মুসলিম যুবকেরা চালকদের জেরা করছেন এবং পশুদের সম্মানের সাথে পরিবহনের আহ্বান জানাচ্ছেন। একই সময়ে বহু মুসলিম ইনফ্লুয়েন্সার এবারের ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে বহু হিন্দু খামারিকে শূন্য হাটে উদ্বিগ্ন ও হতাশ অবস্থায় বাড়ি ফিরতে দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই এই পরিস্থিতির জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত বিজেপি সরকারকে দায়ী করছেন। ‘জেন জি’ নেটিজেনরা ঘটনাটিকে একটি “উনো রিভার্স” মুহূর্ত বলে উল্লেখ করছেন, যেখানে হঠাৎ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা উল্টে গেছে। একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের “গরু সংকট” বিষয়ক প্রতিবেদন মাত্র একদিনে ইউটিউবে ১০ লাখ এবং ফেসবুকে ৩০ লাখ ভিউ অতিক্রম করেছে।
সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত ১৩ মে, যখন নবগঠিত বিজেপি সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ কঠোরভাবে কার্যকরের ঘোষণা দেয়। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি সনদ ছাড়া গবাদিপশু জবাই করা যাবে না এবং কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী অথবা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারানো পশুকেই জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হবে। এছাড়া জবাই কেবল অনুমোদিত কসাইখানায় করা যাবে এবং প্রকাশ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধ থাকবে। আইন ভঙ্গ করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড, এক হাজার রুপি জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই প্রজ্ঞাপন জারির পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ও পুলিশের বিরুদ্ধে গবাদিপশু পরিবহনকারীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। গত ১৬ মে হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি গরুবাহী ট্রাক থামিয়ে গরুর “জন্ম সনদ” দাবি করলে বিষয়টি জাতীয় গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এরপরই মুসলিম সংগঠনগুলো ঈদের জন্য গরু কেনা বয়কটের প্রচারণা শুরু করে এবং বাংলার গবাদিপশু বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণত ঈদের আগে বাংলার গরুর হাটগুলোতে উপচেপড়া ভিড় থাকে। কিন্তু এবার বহু হাট প্রায় ফাঁকা। যেখানে সাধারণ সময়ে ২০০-৩০০ পশু বিক্রি হয়, সেখানে এখন মাত্র কয়েকটি গরু দেখা যাচ্ছে। মুসলিম ক্রেতাদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। পরিবর্তে উদ্বিগ্ন হিন্দু খামারিদের ঋণ, লোকসান ও টিকে থাকার সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যাচ্ছে। বহু খামারি জানিয়েছেন, দুধ দেওয়া বন্ধ করা গরু বিক্রি করতে না পারলে তারা ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন। কেউ কেউ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহকারীদের দেনা এবং শ্রমিকদের বেতন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
খামারিদের আশঙ্কা, অধিকাংশ গরু সাত থেকে আট বছর বয়সের পর দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। অথচ নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১৪ বছরের আগে জবাইয়ের অনুমতি পাওয়া কঠিন। একটি অদক্ষ গরুর পেছনে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ফলে উৎপাদনহীন পশু দীর্ঘদিন পালন করা অনেক কৃষকের জন্য আর্থিকভাবে অসম্ভব হয়ে উঠবে। তারা বলছেন, এতে বহু পরিবার দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম বৃহৎ গরুর মাংস উৎপাদনকারী রাজ্য। এখানে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ গরু এবং ১৫ লাখ মহিষ রয়েছে। রাজ্যের বড় বড় গরুর হাট ও পশু বাজার গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু দরিদ্র কৃষক পরিবারের কাছে গবাদিপশু হচ্ছে জরুরি আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম। সংকটের সময় পশু বিক্রি করেই তারা সংসার চালান। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নতুন বাস্তবতা শুধু মাংস শিল্প নয়, বরং পশুখাদ্য, চামড়া শিল্প, পশুচিকিৎসা, পরিবহন, কসাইখানা, রেস্তোরাঁ ও গ্রামীণ শ্রমবাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজেপি নেতা অবনী মন্ডল স্বীকার করেছেন যে আইন কার্যকরের ফলে খামারিদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি ১৯৫০ সালের আইন, যা আগের সরকারগুলো কার্যকর করেনি। আমরা এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করছি। কিছু সমস্যা হচ্ছে, তবে দ্রুত সমাধান নিয়ে ভাবতে হবে।” অন্যদিকে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে ধর্মীয় প্রয়োজনে জবাইয়ের বিশেষ ছাড় চেয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে প্রশাসনিক জটিলতা ও পশুচিকিৎসক সনদের বাধার কারণে দরিদ্র পশু ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষকরা ভয়াবহ সংকটে পড়ছেন।
তবে মুসলিম সমাজের একটি অংশ নওশাদ সিদ্দিকীর এই অবস্থানেরও সমালোচনা করেছে। অনলাইনে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, “এটা চলতে দিন। আমরা আর গরু খেতে চাই না, এখন তাদের বুঝতে দিন।” সিপিআই(এম) বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানাও ঈদের আগে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে ক্যালকাটা হাইকোর্টে ইতোমধ্যে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা একটি পুরোনো আইনকে হঠাৎ সক্রিয় করে জীবিকা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলার দুগ্ধ শিল্প ও পশু অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খাবে। মুসলিমরা যদি ব্যাপকভাবে গরুর মাংস খাওয়া কমিয়ে দেয়, তবে বিকল্প প্রোটিনের চাহিদা বাড়বে এবং মুরগি, খাসি ও মাছের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে এটি আর কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইস্যু নয়; বরং অর্থনীতি, সমাজ ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার জটিল প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।