হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছালে জাহাজগুলো তাদের ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (ভিএইচএফ) রেডিওর মাধ্যমে নির্ধারিত পাসকোড সম্প্রচার করে এবং এরপর একটি টহল নৌযান এসে সেগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করে নিয়ে যায়; দ্বীপঘেরা উপকূল ঘেঁষে থাকা এই রুটটি ইতোমধ্যেই শিপিং খাতে ‘ইরানি টোলবুথ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে; সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া একটি তেলবাহী জাহাজের পরিচালনাকারীদের ইরানি নৌবাহিনীর সহায়তায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তবে এর শর্ত হিসেবে জাহাজটির নিবন্ধন পরিবর্তন করে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনের কথা বলা হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কোম্পানি নির্বাহী জানিয়েছেন; যদিও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি পাকিস্তান সরকারের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি; সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইরান পাকিস্তানের প্রায় ২০টি জাহাজকে প্রণালি পারাপারের অনুমতি দিয়েছিল, কিন্তু ওই সময় উপসাগরে পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা সীমিত থাকায় ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বড় পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চায় তারা সাময়িকভাবে পাকিস্তানের পতাকা ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে আগ্রহী কি না; এ বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি জানান, পাকিস্তান বিশেষভাবে বড় আকারের জাহাজ, বিশেষ করে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনে সক্ষম সুপারট্যাঙ্কার খুঁজছিল, যাতে এসব জাহাজের পারাপার নিশ্চিত করে চলমান সংকট নিরসনে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য প্রদর্শন করা যায়; অন্তত দুটি বড় তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এমন প্রস্তাব পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে; তবে পাকিস্তানের সামুদ্রিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য দেয়নি; অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নজিরবিহীন কঠোরতা আরোপ করেছে; বিশ্বে ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়; শিপিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং আলোচনায় যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, আইআরজিসি ইতোমধ্যে প্রণালি পার হওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায় শুরু করেছে এবং যেসব দেশকে বন্ধুত্বপূর্ণ মনে করা হয় তাদের জাহাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে যেসব দেশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলছে; ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি হরমুজ প্রণালিতে ফি আরোপ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে; একই সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আরও একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ চলছে; এই ব্যবস্থার আওতায় জাহাজ পরিচালনাকারীদের আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাহাজের মালিকানা, পতাকা, পণ্য, গন্তব্য, নাবিকদের তালিকা এবং স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস)-এর তথ্য জমা দিতে হচ্ছে; পরে ওই প্রতিষ্ঠানটি তথ্যগুলো আইআরজিসি নৌবাহিনীর হরমোজগান প্রাদেশিক কমান্ডে পাঠায়, যাতে যাচাই করা যায় জাহাজটির সঙ্গে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের দৃষ্টিতে শত্রু রাষ্ট্রগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না; অনুমোদন পাওয়া গেলে এরপর টোল নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়; সংশ্লিষ্টদের মতে, ইরান এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত একটি র্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জাহাজ তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্ত পেয়ে থাকে; তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে প্রাথমিক দর সাধারণত প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য প্রায় ১ ডলার ধরা হয়, যা ইউয়ান বা স্থিতিশীল মুদ্রার সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পরিশোধ করা হয়; একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) সাধারণত প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করতে সক্ষম; টোল পরিশোধের পর আইআরজিসি জাহাজকে একটি অনুমোদন কোড ও নির্দিষ্ট রুট নির্দেশনা দেয় এবং জাহাজকে সেই দেশের পতাকা বহন করতে হয়, যে দেশ পারাপারের চুক্তি সম্পন্ন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে নিবন্ধনও পরিবর্তন করতে হয়; এরপর হরমুজ প্রণালির কাছে পৌঁছালে জাহাজটি ভিএইচএফ রেডিওতে পাসকোড সম্প্রচার করে এবং টহল নৌযান সেটিকে নিরাপদে প্রণালি পার করে দেয়; সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা এখনো সংঘাত-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম রয়েছে।
