ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক হামলা চালালে তা কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরাসরি আঘাত তেহরানকে আরও গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ঠেলে দিতে পারে কিংবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক প্রয়োজনে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটছে না। তবে ২০০২ সালে দেশটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের গোপন স্থাপনার তথ্য প্রকাশের পর থেকেই বৈশ্বিক মহলে সন্দেহ তৈরি হয়।
২০১৫ সালে একটি বহুপাক্ষিক পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে ইরানের কর্মসূচিতে কড়াকড়ি সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে সেটি কার্যত ভেঙে পড়ে। এরপর ইরান আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম জোরদার করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যার বিশুদ্ধতা প্রায় ৬০ শতাংশ। এ ধরনের উপাদানকে আরও প্রক্রিয়াজাত করলে অস্ত্র-মানের পর্যায়ে নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ—যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই ইউরেনিয়ামকে গ্যাসীয় অবস্থা থেকে ধাতব রূপে রূপান্তর করে আরও সমৃদ্ধ করা হলে একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল এসব মজুত ও স্থাপনা ধ্বংস করা। সে সময় একটি সামরিক অভিযানের আওতায় ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে শক্তিশালী বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
তবে পরবর্তীতে বিশ্লেষণে উঠে আসে যে পাহাড়ের গভীরে নির্মিত কিছু স্থাপনা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। হামলার পর ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের কিছু স্থানে প্রবেশে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ফলে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সঠিক অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আইএইএ তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে জানায়, ইরান সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করেছে কি না বা সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ঠিক কত পরিমাণ উপাদান রয়েছে—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, এখন পর্যন্ত সংগঠিতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বা শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইস মন্তব্য করেন, সামরিক হামলা একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল। তার মতে, যদি হামলার পরও ইরানের সরকার টিকে থাকে, তবে তারা পুনরায় কর্মসূচি গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে। কারণ এই প্রযুক্তি নতুন নয়; বহু দশক ধরে দেশটিতে এর উন্নয়ন চলছে।
তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ইরান উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্রকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
অস্ত্র বিস্তার প্রতিরোধ বিষয়ক বিশ্লেষক কেলসি ড্যাভেনপোর্টের মতে, সামরিক চাপ বাড়লে ইরানের অভ্যন্তরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে জনমত বা রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি শাসনব্যবস্থার পতন বা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
তার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে উপাদান চুরি বা পাচারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্তর্জাতিক শক্তির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, সম্ভাব্য পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদ বা উপাদান ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে আরও গভীর কূটনৈতিক ও নীতিগত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় সামরিক সমাধান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।