পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনার আগে নিজেদের জব্দ হওয়া সম্পদ ফেরতের দাবি তোলে ইরান এবং একই সঙ্গে চলমান সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের জন্য ক্ষতিপূরণও চায় দেশটি, মঙ্গলবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে চিঠি দেন যেখানে বিভিন্ন দেশের কাছে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য অর্থ দাবি করা হয়, যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি জানিয়েছে তবুও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি, ইরানের বিপ্লবী গার্ড সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানায় আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে দেশটি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ চালিয়ে যাচ্ছে, রুশ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতিমা মাহাজিরানি বলেন প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার যা আরও বাড়তে পারে এবং এই হিসাবের মধ্যে অবকাঠামো ধ্বংস, ভবনের ক্ষতি ও শিল্পকারখানা বন্ধ থাকার আর্থিক লোকসান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকেও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে যদিও বিবিসি স্বাধীনভাবে তা যাচাই করতে পারেনি, ইরানের জব্দ সম্পদ নিয়ে প্রেস টিভি ও বিবিসি নিউজের আগের তথ্যের ভিত্তিতে বিবিসি উর্দু একটি বিশ্লেষণ তৈরি করেছে যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে ইরান তাদের ক্ষতির হিসাব করেছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের নির্দেশে ইরানের বিপুল সম্পদ জব্দ করা শুরু হয় এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আটকে রয়েছে, ইরানি গণমাধ্যম বলছে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর এই ইস্যুটি আবার সামনে এসেছে এবং এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে, প্রেস টিভি জানায় গত প্রায় ৪৭ বছরে ইরানের তেলের আয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ও বাণিজ্যিক সম্পদসহ বিপুল অর্থ আটকে রাখা হয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশে বিভিন্ন সময়ে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়, ১৯৭৯ সালের ১৪ নভেম্বর জিমি কার্টার প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ জব্দের নির্দেশে স্বাক্ষর করেন যার আওতায় শুধু সরকারি অ্যাকাউন্ট নয় বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত ছিল, এর ফলে সিটি ব্যাংক, চেজ ম্যানহাটন, ব্যাংক অব আমেরিকা, এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, বিএনপি পারিবাস, ডয়েচে ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, ক্রেডিট সুইস ও বার্কলেসসহ বড় ব্যাংকগুলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিল্প ও জ্বালানি খাতেও প্রভাব ফেলে, শেল, টোটাল, ইএনআই, সিমেন্স, জেনারেল ইলেকট্রিক ও বোয়িংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান প্রকল্প ছেড়ে চলে যাওয়ায় বহু প্রকল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির আওতায় কিছু সম্পদ ফেরত দেওয়া হলেও তা অসম্পূর্ণ ছিল এবং ইরান প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলার পায়, বাকি অর্থ মার্কিন কোম্পানি ও নাগরিকদের দাবির জন্য রাখা হয়, এই চুক্তির অধীনে হেগে ইরান-আমেরিকা ক্লেইমস ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয় যা এখনো বিরোধ নিষ্পত্তি করে, জব্দ সম্পদের নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন সূত্রে ৮ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার প্রাথমিকভাবে আটকে ছিল বলে জানা যায়, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি জেসিপিওএ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আশা তৈরি করে এবং তখন ইরানের আটকে থাকা অর্থ নিয়ে বিভিন্ন হিসাব সামনে আসে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রথমে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের কথা বললেও পরে তা ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়নে নামিয়ে আনেন, একই বছরে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ভালি আসেফ জানান জব্দ সম্পদ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার যার মধ্যে ২৩ বিলিয়ন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এবং ৬ বিলিয়ন ভারতের কাছে তেল বিক্রির আয় ছিল, চুক্তির আওতায় ইরান ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার ব্যবহারের সুযোগ পেলেও তা ছিল সাময়িক কারণ ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে গিয়ে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ফলে সেই অর্থ আবারও ফ্রিজ হয়ে যায়, ২০২৩ সালের বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারের নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয় তবে এই অর্থ শুধুমাত্র খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কৃষিপণ্য কেনায় ব্যবহারের শর্ত আরোপ করা হয় এবং প্রতিটি লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন জানান এই অর্থ ইরানকে সীমিত সুবিধা দেবে, একই চুক্তিতে পাঁচ ইরানি নাগরিক মুক্তির কথাও বলা হয়, পরে কাতারের আমির তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে সাক্ষাতে এই অর্থ ছাড়ের দাবি তুললেও ২০২৪ সালে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা বাড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র কাতারকে ওই অর্থে প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে বলে ফলে অর্থটি আবারও অপ্রাপ্য হয়ে পড়ে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন বছরের পর বছর সম্পদ জব্দ থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা কঠিন এবং ইরান তার দায়িত্ব পালন করলেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, তাই আস্থা ফেরাতে বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং তিনি স্পষ্ট করেন যে জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া ইরানের জন্য অচলাবস্থাহীন শর্ত, এটি পূরণ না হলে কোনো আলোচনায় বড় অগ্রগতি সম্ভব নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থের পরিমাণ
Oplus_131072
You Might Also Like
Sign Up For Daily Newsletter
Be keep up! Get the latest breaking news delivered straight to your inbox.
[mc4wp_form]
By signing up, you agree to our Terms of Use and acknowledge the data practices in our Privacy Policy. You may unsubscribe at any time.
Create an Amazing Newspaper
Discover thousands of options, easy to customize layouts, one-click to import demo and much more.
Learn More