যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানকে মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছেন। সাম্প্রতিক একাধিক আলোচনায় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি এবং সেটির পরিবর্তন জরুরি। একই সময়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-ও ইরানকে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, যেখানে একটি দুর্বল বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জর্জরিত ইরান তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরব আশঙ্কা করে যে, ইরানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে সেটি সরাসরি তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের নীতিনির্ধারক মহলে উদ্বেগ রয়েছে যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইরান সৌদি তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। প্রকাশ্যে ট্রাম্প কখনো দ্রুত যুদ্ধ সমাপ্তির ইঙ্গিত দেন, আবার কখনো পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন, যা তার নীতিগত অবস্থানকে কিছুটা অস্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন যে ইরানের সঙ্গে বৈরিতা কমানোর বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে, যদিও ইরান তা অস্বীকার করেছে। এই সংঘাত ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলেছে এবং ইরানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে তেলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেই রয়েছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, তাদের প্রধান উদ্বেগ দেশের নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে চলমান হামলা থেকে রক্ষা করা। অভ্যন্তরীণ আলোচনায় জানা যায়, ট্রাম্প কখনো উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দিলেও সৌদি নেতৃত্ব মনে করে এখন পিছু হটা কৌশলগত ভুল হতে পারে, তাই তারা ইরানের সামরিক ও জ্বালানি সক্ষমতা দুর্বল করার পক্ষে মত দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে, যদিও হোয়াইট হাউস এসব ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান শুধুমাত্র রাজনীতির কারণে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এতে বড় ভূমিকা রাখছে, কারণ হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে তেল পরিবহন বিঘ্নিত হচ্ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে, যদিও বিকল্প পাইপলাইন রয়েছে কিন্তু সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না এবং হামলার ঝুঁকিও রয়েছে। সৌদি নীতিনির্ধারকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো—যদি এই সংঘাত অসম্পূর্ণ অবস্থায় শেষ হয়, তবে একটি ক্ষুব্ধ ইরান ভবিষ্যতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে, একই সঙ্গে অতীতে তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার অভিজ্ঞতা তাদের এই আশঙ্কাকে আরও জোরদার করেছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, কারণ তারা ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, কিন্তু চলমান সংঘাত বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সর্বশেষে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাদের মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের হামলা বন্ধ করা, এজন্য তারা কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সব ধরনের উপায় ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।
