হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি দিন দিন আরও জটিল ও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কেন্দ্র করে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যে কৌশল অবলম্বন করছে, তা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকেও ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এ বিষয়ে বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে বলেন, ইরান সরাসরি বড় ধরনের সংঘর্ষে না গিয়ে বরং ধীরে ধীরে অস্থিরতা তৈরি করে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই খেলায় মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলা এবং সময়ের সাথে সাথে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান। হরমুজ প্রণালির উত্তর উপকূল ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়, ফলে এই নৌপথে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইরান একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি ও শক্তিধর দেশগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন এই প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ক্রিগ আরও উল্লেখ করেন, ইরান কার্যত বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, তারা এই অচলাবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখতে সক্ষম। এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি সংঘাত নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী কৌশল, যেখানে সময়ই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত সমাধান আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সহ অনেকেই হরমুজ প্রণালিকে দ্রুত বাধামুক্ত করার দাবি তুলেছেন। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে কোনো প্রথাগত সামরিক শক্তির পক্ষেই অল্প সময়ের মধ্যে এমন একটি জটিল ও স্পর্শকাতর নৌপথকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করা প্রায় অসম্ভব।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে এটি এমন এক দীর্ঘমেয়াদি সংকট, যার প্রভাব ভবিষ্যতেও বিশ্ব রাজনীতিতে গভীরভাবে অনুভূত হবে।