মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী রক্ষা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেলান্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি ন্যাটো মিত্রদের উদ্দেশে বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত নিজেদের অঞ্চল নিজেরাই রক্ষা করা, কারণ এটি মূলত তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকা।
রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অপরিহার্য নাও হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন করে এবং এই জলপথের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। তার ভাষায়, “আমাদের প্রচুর তেল রয়েছে, তাই যুক্তি করা যেতে পারে যে সেখানে আমাদের উপস্থিতি প্রয়োজন নাও হতে পারে।”
তবে এই মন্তব্যের আগে তিনি ইউরোপীয় ও ন্যাটো মিত্রদের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেন যাতে তারা প্রণালীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের অবস্থান আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সামরিক হামলার সুস্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করতে না পারায় তিনি আগেই সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে তার একাধিক বক্তব্যে স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সহযোগিতা অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্যও অন্তর্ভুক্ত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, একটি অপ্রয়োজনীয় সংঘাত শুরু করার পর এখন তিনি অন্য দেশগুলোর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন। কিছু সমালোচক নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারের কথাও তুলে ধরেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন, যদি এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা প্রয়োজন না হয়, তবে এত প্রাণহানির দায় কে নেবে।
এদিকে নিহত এক মার্কিন বিমানসেনার পরিবারের সদস্য গণমাধ্যমে জানান, তারা এমন এক দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন যা কল্পনাতীত। তাদের মতে, এই সংঘাত এড়ানো সম্ভব ছিল এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়া উচিত ছিল না।
হরমুজ প্রণালী রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও জাপানসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই মুহূর্তে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, তারা ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে প্রণালী পুনরায় চালু করার একটি কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন, তবে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
অন্যদিকে লুক্সেমবার্গের উপ-প্রধানমন্ত্রী জেভিয়ার বেটেল স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাদের দেশ কোনো ধরনের চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না।
মার-এ-লাগো থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, হরমুজ প্রণালী সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা মূলত অন্যান্য দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য। তিনি বলেন, এটি অনেকটা অভ্যাসগত দায়িত্বের মতো, তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও উপকার হয়।
তিনি আরও জানান, বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং তারা সহায়তায় এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করছেন, যদিও কোনো দেশের নাম তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি। এর আগে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশ এতে অংশ নেবে।
একই সময়ে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, যদি ন্যাটো দেশগুলো এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করে, তবে ভবিষ্যতে তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীনের অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তার নির্ধারিত বৈঠক বা সফরও বিলম্বিত হতে পারে।
সার্বিকভাবে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক কৌশল এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হরমুজ রক্ষায় ‘হয়তো আমাদের থাকারই দরকার নেই, কারণ আমাদের তেলের অভাব নেই’: ট্রাম্প
