মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান নতুন করে আন্তর্জাতিক নজরে এসেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত অভিযানের পর দেশটির সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষের পাশাপাশি ইরান পারস্য উপসাগর অঞ্চলে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির পথও বেছে নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইরান গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে। পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি—যা ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিপুলসংখ্যক ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ হামলাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও কিছু আঘাত সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোয় পড়েছে বলে জানা যায়।
ব্রিটিশ অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for Information Resilience ইরানকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ড্রোন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের মাসিক ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের পরিমাণ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু অনুমানে সংখ্যা কয়েক হাজারের মধ্যে হতে পারে। তবে চলমান হামলা ও পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে এসব অস্ত্র কতদিন কার্যকর থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান Rapidan Energy Group–এর প্রধান বব ম্যাকন্যালির মতে, ইরান সরাসরি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে না চাইলেও সেখানে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির পরিবেশ বজায় রাখতে আগ্রহী হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, যদি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সীমিত হয়ে আসে, তাহলে ইরান বিকল্প কৌশল হিসেবে সামুদ্রিক মাইন ব্যবহারের পথও বিবেচনা করতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ নৌ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম।
ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি কৌশলগত নৌপথকে কেন্দ্র করে চাপ সৃষ্টি—এ দুটি দিকই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতি অনেকাংশেই নির্ভর করবে কূটনৈতিক তৎপরতা ও সামরিক সংযমের ওপর।