নিরাপত্তা নাকি বেঁচে থাকা—এই কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বহু বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক আজ দিশেহারা। ঋণের বোঝা, অসুস্থ বাবা-মা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে তারা এক গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর দিন কাটাচ্ছেন। দেশে ফিরতে চাইলেও বাস্তবতা তাদের সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেখানে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবনে। প্রতিনিয়ত আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং আয়ের আশঙ্কাজনক পতনে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি কয়েকজন প্রবাসী শ্রমিকের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা। কোথাও মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল ছুটে যাচ্ছে, কোথাও হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে চারপাশ। এই অবস্থায় তারা প্রতিদিন কাটাচ্ছেন চরম উদ্বেগ আর আতঙ্কে। একদিকে জীবনের ঝুঁকি, অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের দায়িত্ব—এই দ্বন্দ্বে তারা আটকে পড়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত এক প্রবাসী জানান, তিনি এমন একটি এলাকায় থাকেন যেখানে কাছাকাছি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ফলে প্রায়ই বিস্ফোরণ বা মিসাইলের শব্দ শোনা যায়। প্রতিটি শব্দেই মনে হয়, এই বুঝি শেষ সময়। তবুও তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না, কারণ তাতে হারাতে হবে তার একমাত্র আয়ের উৎস।
সৌদি আরবে কর্মরত আরেকজন প্রবাসী বলেন, আগে তিনি নিয়মিত ভালো আয় করে দেশে টাকা পাঠাতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজ কমে যাওয়ায় আয় অনেক কমে গেছে। ঋণের চাপ এত বেশি যে দেশে ফিরে যাওয়ার চিন্তাও করতে পারছেন না। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন আরও অনেকে—কারও কাজ বন্ধ, কারও আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে, আবার কেউ কেউ প্রায় বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
কিছু এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে, যার ফলে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। এতে করে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেকেই দিনের পর দিন ঘরের ভেতর অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন, বাইরে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে থাকা পরিবারগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে। প্রবাসীদের স্ত্রী-সন্তানরা প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকছেন। তবুও তাদের কাছে বিকল্প কোনো পথ নেই—কারণ প্রবাসী আয়ই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শুধু প্রবাসীদের জীবনই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট তাই এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়—এটি লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবনসংগ্রামের এক কঠিন বাস্তবতা।