যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালীকে চাপের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। একই সময়ে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধে অনড় অবস্থানে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা তার কাছে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির দাবি, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পাঠানো তেহরানের প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ থামাতে আলোচনার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন গোলাগুলির ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত শেষ হবে’। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরানের মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুরোপুরি সরিয়ে না ফেলা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলা যাবে না। মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠান সিক্সটি মিনিটসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এখনও এমন কিছু সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো ধ্বংস করতে হবে।”
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরানের প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও বলেছেন, “আমরা কখনো শত্রুর সামনে মাথা নত করব না। আলোচনা বা সংলাপ মানেই আত্মসমর্পণ নয়।”
ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “আমি ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের জবাব পড়েছি। এটি আমার পছন্দ হয়নি— সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এক পাতার ১৪ দফা প্রস্তাবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালীতে অবাধ জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এসব শর্ত চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভরশীল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালীতে কড়াকড়ি অবস্থা বজায় রেখেছে, যার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। অপরদিকে তেহরানকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ জারি রেখেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। পরে গত মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইসরাইলের সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা ধীরে ধীরে শূন্যে নামিয়ে আনতে চান তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরাইলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়।
নেতানিয়াহু বলেন, “এখনই শুরু করা উচিত এবং আগামী এক দশকে আমরা এই সহায়তা থেকে নিজেদের মুক্ত করব।”
ইরান এদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার বিষয়ে সতর্ক করেছে। ইরানের সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে “কঠোর পরিণতির” মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা ইরনা এ তথ্য জানিয়েছে।
আকরামিনিয়া বলেন, “আমেরিকানদের তাদের নৌবহর দিয়ে উত্তর ভারত মহাসাগরের এই বিশাল অঞ্চলকে প্রকৃত অবরোধে পরিণত করতে দেওয়া হবে না।”
চলমান সংঘাতে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকে তেহরান প্রণালিটিকে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী বিভিন্ন জাহাজকে সতর্ক করেছে এবং কয়েকটি ঘটনায় হামলার অভিযোগও উঠেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটি হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সুরক্ষার মিশনে অংশ নিতে পারে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই নৌ-নিরাপত্তা উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। স্টারমার বলেছেন, ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পরই কেবল এই মিশন বাস্তবায়ন করা হবে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান রোববার সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালীতে ফ্রান্স বা ব্রিটেন কোনো বাহিনী মোতায়েন করলে “তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব” দেওয়া হবে। তবে পরে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স সরাসরি নৌ মোতায়েনের কথা ভাবেনি; বরং ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নিরাপত্তা মিশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের বিরুদ্ধেও পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছে ইরান। যুক্তরাজ্যের ম্যারিটাইম ট্রেড অপারেশন্স জানিয়েছে, কাতারের দোহার উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ছোট আকারের আগুন লাগলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পরে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করে, জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী এবং মার্কিন মালিকানাধীন ছিল।
রোববার কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ড্রোন সেনাবাহিনী প্রতিহত করেছে। কয়েক ঘণ্টা পর সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানায়, ইরান থেকে আসা দুটি ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।
হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনা নিয়ে সোমবার ৪০টির বেশি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠকে বসছেন। বৈঠকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এবং ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথেরিন ভট্রিন যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। যুদ্ধ বন্ধ হলে কীভাবে সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সেখানে জোটভুক্ত দেশগুলো পরিকল্পনা তুলে ধরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে গত ৬ মে ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, “ইরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে বোমা হামলা শুরু হবে এবং তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বড় ও ভয়াবহ হবে।”
সূত্র : বিবিসি