উম্মতের প্রতি নবীজীর (ﷺ) ও নবীজীর (ﷺ) প্রতি মু’মিনদের ভালোবাসা আমরা ছিলাম এক অন্ধকারের মধ্যে পথহারা ও দিশেহারা। হেদায়াত সম্পর্কে ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অতঃপর মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে হেদায়েতের বার্তা দিয়ে প্রেরণ করলেন। তিনি এসে আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করলেন। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য উন্মোচন করলেন। আমাদেরকে সত্য দ্বীনের পরিচয় দিলেন এবং নাজাতের পথ দেখিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের শিক্ষা দিলেন। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اِذْ بَعَثَ فِيْهِمْ رَسُوْلًا مِنْ اَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْا عَلَيْهِمْ اَيَاتِه وَ يُزَكِّيْهِمْ وَ يُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَ الْحِكْمَةَ وَ اِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِيْ ضَلَالِ مُّبِيْنِ। তরজমা: “আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন; যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল।” (সূরা আলে ইমরান)। নবী করীম হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ) যেমন সকল নবীর সর্দার, তেমনি সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বমহান। তিনি এমন এক দ্বীন রেখে গেছেন, যে দ্বীন কোনো ভেদাভেদ শেখায় না। তিনি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে। কারণ তাঁর গড়া সমাজ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহীর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তবে এই সমাজ থেকে উপকৃত হয় তারাই, যারা ঈমান গ্রহণ করে। কেননা নবী পাক (ﷺ) সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ। অর্থ: “হে নবী! আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া)। নবী পাক (ﷺ) তাঁর উম্মতের প্রতি ছিলেন অগাধ মায়া, মমতা ও ভালোবাসার প্রতীক। তিনি কখনো উম্মতের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করেননি। তিনি চেয়েছেন শুধু উম্মতের কল্যাণ ও সফলতা, যাতে তারা হেদায়াতের পথ হারিয়ে অন্ধকারে পতিত না হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন নবী করীম (ﷺ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এই দোয়া তিলাওয়াত করলেনঃ رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর এই বক্তব্যও পাঠ করলেনঃ إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ। এরপর নবীজী (ﷺ) দু’হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বললেনঃ اللّٰهُمَّ أُمَّتِي أُمَّتِي — “হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!” তখন আল্লাহ তা’আলা জিবরাইল (আঃ)-কে বললেন, “মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং জিজ্ঞেস করো, তিনি কেন কাঁদছেন?” যদিও আল্লাহ সবই জানেন। পরে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ إِنَّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمَّتِكَ وَلَا نَسُوءُكَ অর্থাৎ, “আমি অবশ্যই তোমাকে তোমার উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করবো এবং কষ্ট দিব না।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২০২)। আরেক স্থানে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا। তরজমা: “হে নবী! তারা যদি এ বাণীর প্রতি ঈমান না আনে, তবে মনে হয় আপনি দুঃখে নিজের প্রাণই ধ্বংস করে ফেলবেন।” (সূরা কাহাফ: ৬)। এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়, নবী করীম (ﷺ) তাঁর উম্মতের প্রতি কত গভীর মায়া ও ভালোবাসা পোষণ করতেন। নবী পাক ﷺ সর্বদা তাঁর উম্মতের সফলতার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন, যাতে উম্মত গুনাহের অন্ধকারে নিমজ্জিত না হয় এবং আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে অবস্থান করে। তিনি কখনো উম্মতের প্রতি অসন্তুষ্ট হননি; বরং সর্বদা হেদায়াতের জন্য দোয়া করেছেন। অন্যদিকে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) নবীজী (ﷺ)-কে নিজেদের জান-মালের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তাঁরা নিজেদের ধন-সম্পদ, জীবন ও স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নবীজীর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ। অর্থ: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমগ্র মানবজাতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫)। হযরত উমর (রাঃ)-এর ঘটনাও এ ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি একদিন বললেনঃ يَا رَسُولَ اللهِ لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مِنْ نَفْسِي — “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে সবকিছুর চেয়ে প্রিয়, তবে আমার নিজের প্রাণ ছাড়া।” তখন নবীজী (ﷺ) বললেনঃ لَا، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ — “না, সেই সত্তার কসম! যতক্ষণ না আমি তোমার নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় হই।” তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেনঃ فَإِنَّهُ الآنَ وَاللهِ لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي — “এখন আল্লাহর কসম! আপনি আমার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়।” তখন নবীজী (ﷺ) বললেনঃ الآنَ يَا عُمَرُ — “এখন, হে উমর!” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৬৩২)। উহুদ যুদ্ধের ময়দানে হযরত আবু তালহা (রাঃ) নিজের বুককে ঢাল বানিয়ে নবীজী (ﷺ)-কে রক্ষা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ يَا نَبِيَّ اللهِ بِأَبِي أَنتَ وَأُمِّي لَا تُشْرِفْ يُصِيبُكَ سَهْمٌ مِنْ سِهَامِ الْقَوْمِ نَحْرِي دُونَ نَحْرِكَ। অর্থ: “ইয়া আল্লাহর নবী! আমার মা-বাবা আপনার জন্য কোরবান হোক। আপনি উঁকি দেবেন না, যাতে শত্রুর কোনো তীর আপনার গায়ে না লাগে। আমার বুক আপনার বুকের আগে উৎসর্গিত।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮১১)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও ইরশাদ করেছেনঃ المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ — “মানুষ যাকে ভালোবাসে, কিয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে।” (সহীহ মুসলিম)। প্রকৃত ভালোবাসা হলো প্রিয় ব্যক্তির আদর্শ, চিন্তা-চেতনা, ভালো-মন্দ ও জীবনপদ্ধতির অনুসরণ করা। আর নবীজী (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসার অর্থ হলো তাঁর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা, তাঁর আদেশ পালন করা এবং তাঁর স্মরণে অন্তরকে সজীব রাখা। দরূদ শরীফ পাঠ নবীজী (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেনঃ (أَنَّهَا سَبَبٌ لِدَوَامِ مَحَبَّتِهِ لِلرَّسُولِ (ﷺ وَزِيَادَتِهَا وَتَضَاعُفِهَا — “দরূদ শরীফ রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসা স্থায়ী, বৃদ্ধি ও বহুগুণে প্রবল হওয়ার কারণ।” পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا। তরজমা: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত নাযিল করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর।” (সূরা আহযাব)। এক কবি সুন্দরভাবে বলেছেনঃ اس دورِ سکون میں تسکین نہ ملے گی، کیفِ دل و جاں ذکرِ پیمبر (ﷺ) سے ملے گا। অর্থ: “এই অশান্তির যুগে কোথাও প্রকৃত শান্তি মিলবে না; হৃদয় ও আত্মার প্রশান্তি তো কেবল প্রিয় নবী (ﷺ)-এর স্মরণেই মিলবে।” উপসংহারে বলা যায়, হুজুর মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর অগাধ মায়া-মমতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সর্বদা উম্মতের কল্যাণ কামনা করেছেন। তিনি আল্লাহর দরবারে উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন, যেন তারা বালা-মুসিবত ও আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা পায়। অপরদিকে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) নবীজী (ﷺ)-কে নিজেদের জান-প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। আজ আমরা যদি তাঁদের সেই ভালোবাসার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তবে উপলব্ধি করতে পারবো— আমরা এখনও প্রকৃত ইশকে রাসূল (ﷺ) থেকে অনেক দূরে রয়েছি। বাস্তবেই কি আমরা নবীজী ﷺ-কে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে পেরেছি? আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে হুজুর মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সত্যিকারের মহব্বত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
উম্মতের প্রতি নবীজীর ও নবীজীর প্রতি মু’মিনদের ভালোবাসা
Oplus_131072
Sign Up For Daily Newsletter
Be keep up! Get the latest breaking news delivered straight to your inbox.
[mc4wp_form]
By signing up, you agree to our Terms of Use and acknowledge the data practices in our Privacy Policy. You may unsubscribe at any time.
Create an Amazing Newspaper
Discover thousands of options, easy to customize layouts, one-click to import demo and much more.
Learn More