ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চান। তবে হঠাৎ করে নয়, বরং নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। ডেইলি মেইলের প্রতিবেদক ড্যান হজেসের দাবি, গতকাল বিকেলে মন্ত্রিসভার এক সদস্য তাকে জানিয়েছেন, “কিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে পারছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন, চলমান এই বিশৃঙ্খলা আর দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তিনি মর্যাদা বজায় রেখেই নিজের পছন্দের সময়ে পদত্যাগ করতে চান এবং এ বিষয়ে একটি সময়সূচিও ঘোষণা করবেন।”
মন্ত্রিসভার আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এই ঘোষণা কবে আসবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। স্টারমারের কয়েকজন প্রবীণ সহযোগী তাকে আপাতত কোনো মন্তব্য না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রচারণার পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।
এক মন্ত্রীর ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রীর সাবেক চিফ অব স্টাফ মরগ্যান ম্যাকসুইনি তাকে আরও কিছুদিন টিকে থাকার অনুরোধ করছেন। তার ধারণা, যদি লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হয় কিংবা অ্যান্ডির পরাজয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতেও পারে।”
তবে স্টারমারের এক সমর্থক মনে করছেন, উপনির্বাচনের ফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করার ঝুঁকি তিনি নেবেন না। কারণ তাতে তার ব্যক্তিগত মর্যাদায় আঘাত লাগতে পারে। যদি অপেক্ষার পর অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জয়ী হন, তাহলে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে বার্নহ্যামের চাপেই স্টারমারকে পদ ছাড়তে হয়েছে।
নিজ দলের ভেতরেই এখন তীব্র চাপে রয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির অনেক আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যেই তার প্রতি অনাস্থা জানাতে শুরু করেছেন। একের পর এক এমপি নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি তুলছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, স্টারমারের আগাম পদত্যাগের ঘোষণা ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার প্রচারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে। লেবার পার্টির এক প্রবীণ সহযোগী বলেন, “অ্যান্ডি বার্নহ্যামের শিবির চায়, ১৮ জুনের মেকারফিল্ড ভোটের আগে স্টারমার যেন কোনো ঘোষণা না দেন। কারণ ব্যালটে কিয়ার স্টারমারের নাম থাকলে নির্বাচনী লড়াই আরও সহজ হবে।”
তাদের পরিকল্পনা হলো ভোটারদের বোঝানো—“অ্যান্ডিকে ভোট দিন, তিনি ওয়েস্টমিনস্টারে গিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে পরিবর্তন আনবেন।”
যদিও বার্নহ্যাম শিবিরের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, স্টারমার কবে পদত্যাগ করবেন তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন নন। তবে তার এক ঘনিষ্ঠ মিত্র বলেন, “আমরা প্রচারের বার্তাকে সহজ রাখতে চাই। যাতে সরাসরি বলা যায়—আপনারা যদি পরিবর্তনের ধীরগতিতে হতাশ হয়ে থাকেন, তাহলে অ্যান্ডিকে ভোট দিন এবং অবিলম্বে পরিবর্তন দেখুন।”
গত এক সপ্তাহ ধরে স্টারমার ও তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সোমবার সন্ধ্যায় একের পর এক জুনিয়র মন্ত্রীর পদত্যাগে সরকার টালমাটাল হয়ে পড়ে। তখনই স্টারমার বুঝতে শুরু করেন যে পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি প্রবীণ মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু একই সময়ে তার বিরুদ্ধে দলীয় ভেতর থেকেই আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু হয়, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্টারমার নাকি বলেছেন, “আমি সবকিছু ভদ্রভাবে সামলাতে চাইছি, আর ওরা আমার পিঠে ছুরি মারছে।”
পরদিন সকালে তার চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোন্সকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয় সম্ভাব্য পদত্যাগ ঘোষণার পরিবেশ তৈরি করতে। কিন্তু পরে হঠাৎ করেই ডাউনিং স্ট্রিট থেকে নির্দেশ আসে, “সুর বদলাও। আমরা এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।”
এরপরের ৪৮ ঘণ্টায় মন্ত্রিসভার ভেতরের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শাবানা মাহমুদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জশ সাইমন্স ‘দ্য টাইমস’-এ এক নিবন্ধ লিখে ক্ষুব্ধ এমপিদের আরও উসকে দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “আমার মনে হয় না প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন। জনগণ তার প্রতি আস্থা হারিয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই উচিত।”
এই মন্তব্যে স্টারমার গভীরভাবে আহত হন। কারণ সাইমন্স একসময় তার অন্যতম কৌশলবিদ ছিলেন।
এদিকে ডাউনিং স্ট্রিটের অভ্যন্তরেও তার সমর্থন কমতে শুরু করেছে। স্টারমারের এক সমর্থক অভিযোগ করেন, “অনেকে সামনে এসে বলছিলেন, ‘আমরা এখনও আপনার সঙ্গেই আছি।’ কিন্তু ঘর থেকে বের হয়েই তারা আবার ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলাচ্ছিলেন।”
চূড়ান্ত ধাক্কা আসে বৃহস্পতিবার। ডাউনিং স্ট্রিট আশা করেছিল অর্থনীতি ও এনএইচএসের চিকিৎসা অপেক্ষমাণ তালিকা কমে আসার ইতিবাচক খবর দিয়ে তারা নতুন উদ্যমে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু সেই সময়ই চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “চ্যান্সেলর হিসেবে আমি স্বাস্থ্যখাতে বছরে অতিরিক্ত ২৯ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিতে পেরেছি।”
‘প্রধানমন্ত্রী এবং আমি’ না বলে শুধু ‘আমি’ শব্দ ব্যবহার করাকে রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক মন্ত্রীর মন্তব্য, “রিভস আসলে নিজেকে স্টারমারের থেকে আলাদা করে ফেলছেন।”
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন ওয়েস স্ট্রিটিং। পরে খবর আসে, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পার্লামেন্টে ফেরার পথ তৈরি করতে মেকারফিল্ড আসন ছেড়ে দিচ্ছেন জশ সাইমন্স।
ডাউনিং স্ট্রিট শেষ মুহূর্তে লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যদের রাজি করানোর চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়। ডেপুটি লিডার লুসি পাওয়েল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে দেন। এনইসির এক সদস্য বলেন, “ডাউনিং স্ট্রিট কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।”
কয়েকদিন আগেও স্টারমারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেছিলেন, “কিয়ার ভীষণ একগুঁয়ে মানুষ। তিনি বিশ্বাস করেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুই শেষ নয়।” কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, স্টারমারও হয়তো বুঝে গেছেন—তার রাজনৈতিক টিকে থাকার পথ এখন প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে।