বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডেলান্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের মাত্র কয়েকদিন পরেই পুতিনের এই সফরকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা “বিশ্বশক্তির নতুন ভারসাম্য নির্ধারণের প্রচেষ্টা” হিসেবে দেখছেন। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং পশ্চিমা প্রভাব মোকাবিলায় যৌথ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকের শুরুতেই শি জিনপিং বলেন, চীন ও রাশিয়াকে “আরও ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা ও কৌশলগত সহযোগিতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। অন্যদিকে পুতিন দাবি করেন, রাশিয়া-চীন সম্পর্ক ইতিহাসের “অভূতপূর্ব উচ্চতায়” পৌঁছেছে এবং এই অংশীদারিত্ব বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চীনের অবস্থান। পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে বেইজিং প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে মস্কোকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে চীনে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে গোপনে ড্রোন প্রযুক্তি ও আধুনিক যুদ্ধ কৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা সবসময় “নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের” পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা বিশ্বকে নতুন উদ্বেগে ফেলেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্জ আশা প্রকাশ করে বলেছেন, শি জিনপিং পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধে চাপ দেবেন। তবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইয়ান স্টোরির মতে, বেইজিং কখনোই এমন অবস্থানে যাবে না যাতে রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। বরং চীন ভবিষ্যতেও জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থন, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি দিয়ে মস্কোর পাশে থাকবে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল জ্বালানি সহযোগিতা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপীয় বাজার হারিয়ে রাশিয়া এখন চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২” নামের বিশাল গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে দুই নেতা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রস্তাবিত ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন বছরে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস চীনে সরবরাহ করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে চালু থাকা “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-১” পাইপলাইনের মাধ্যমে গত বছর রাশিয়া চীনে ৩৮ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস রপ্তানি করেছে।
জ্বালানি খাতে রাশিয়া-চীন সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর। চীন বর্তমানে রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ২০২৫ সালে চীন প্রায় ১০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি রুশ তেল আমদানি করেছে, যা দেশটির মোট আমদানিকৃত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই চীনে রুশ তেল রপ্তানি ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাশিয়া নিজেকে “বিশ্বস্ত জ্বালানি সরবরাহকারী” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের জুনিয়র অংশীদার থাকা চীন এখন অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাবের দিক থেকে রাশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাড়তে থাকায় ক্রেমলিন ক্রমশ বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্তমান রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক “অসম কিন্তু কৌশলগতভাবে অপরিহার্য জোট” হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য, ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য গতি, পশ্চিমা জোটের কৌশল এবং এশিয়া-কেন্দ্রিক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন নজর থাকবে—চীন কি সত্যিই শান্তি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকবে, নাকি রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী হিসেবেই তার অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।