মধ্যপ্রাচ্যে গাজা যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক চাপের মধ্যে এবার লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ইসরাইল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস ও তেল আবিবের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আগামী নভেম্বর মাস থেকে সপ্তাহে দুই দিন এই সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হবে। প্রায় বারো হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ হবে ইসরাইলের জাতীয় বিমান সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ রুট। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়; বরং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাড়িয়ের মিলেই এই উদ্যোগকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন যুগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে ইসরাইল এখন নতুন মিত্র খুঁজছে এবং সেই লক্ষ্যেই লাতিন আমেরিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, ইসরাইল এখন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, নজরদারি ব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তিকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রযুক্তিকে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে নিরাপত্তা সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানবাধিকার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে ইসরাইল।
বিশ্লেষক ইহাব জাবারিনের মতে, এই সরাসরি বিমানপথ কেবল ভ্রমণের জন্য নয়; বরং এটি হবে নিরাপত্তা ব্যবসা, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি স্থায়ী করিডোর। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে ইসরাইল। ইতোমধ্যে ইথিওপিয়া, কেনিয়া, চাদ ও সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যেই নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ইসরাইলপন্থী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এই সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী মহলের সমর্থন অর্জন করতে চান এবং একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী রাজনীতির বিপরীতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছেন।
নতুন এই বিমানপথকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক আইনি চাপ এড়ানো। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলি কর্মকর্তা ও সেনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা বাড়ছে। বর্তমানে ইউরোপ হয়ে আর্জেন্টিনায় যেতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং নিরাপত্তা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজলেন স্নোট্রি দাবি করেছেন যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার উদ্যোগ নিয়েছে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেও গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত চলছে।
তবে এই প্রকল্প ঘিরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ পথ হওয়ায় বিমান পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যয় হবে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না পারায় বিমানগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হবে। এজন্য ইসরাইল সরকার বিমান সংস্থাকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর্জেন্টিনার ভেতরেও এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী নেতারা অভিযোগ করছেন, সরকার সংসদের অনুমোদন ছাড়াই দেশকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলছে। এছাড়া দক্ষিণ আর্জেন্টিনার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরাইলি পর্যটকদের বিরুদ্ধে পরিবেশ ধ্বংস ও অগ্নিকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন সরাসরি বিমান চলাচল শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়; বরং এটি লাতিন আমেরিকায় ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।