বিশ্বব্যাপী ২০২৩ সালে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ নানা ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন, যা ১৯৯০ সালের তুলনায় প্রায় ৯৫.৫ শতাংশ বেশি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণায় উদ্বেগ ও বিষণ্নতাকে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত মানসিক সমস্যা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর পরেই রয়েছে ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক জটিলতা।
গবেষণাটিতে বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মানুষের মধ্যে ১২ ধরনের মানসিক সমস্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটময় হয়ে উঠছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান লেখক ড্যামিয়ান সান্তোমাউরো জানিয়েছেন, গবেষণার ফলাফল তাকে বিস্মিত করেছে। তার মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে একাধিক সামাজিক ও বৈশ্বিক কারণ রয়েছে এবং এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষণায় বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি, অ্যানোরেক্সিয়া, বুলিমিয়া, ডিস্টাইমিয়া, কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার এবং অজ্ঞাত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতাসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৫৮ শতাংশ এবং বিষণ্নতার হার বেড়েছে প্রায় ১৩১ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে অ্যানোরেক্সিয়া, বুলিমিয়া ও সিজোফ্রেনিয়ার হার কম হলেও ২০২৩ সালে এসব সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যথাক্রমে প্রায় ৪০ লাখ, ১ কোটি ৪০ লাখ এবং ২ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছেছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বেশিরভাগ মানসিক সমস্যা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও অটিজম, এডিএইচডি, কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার, ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা ও অজ্ঞাত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়।
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর ছাপ ফেলেছে। গবেষকরা বলছেন, মহামারির আগ থেকেই উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বাড়ছিল, তবে করোনাকালে বিষণ্নতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় এবং এখনো তা আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে আসেনি। উদ্বেগজনিত সমস্যাও ২০২৩ সাল পর্যন্ত উচ্চ পর্যায়েই ছিল।
এই গবেষণা ২০২৩ সালের “গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজেস, ইনজুরিজ অ্যান্ড রিস্ক ফ্যাক্টরস স্টাডি”-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন বিশ্বের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের অন্যতম বৃহৎ এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তরুণদের মধ্যে বাড়ছে মানসিক ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এখন অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নারী এবং ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবারই প্রথম ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অতীতে সাধারণত মধ্যবয়সীদের মধ্যেই এ প্রবণতা বেশি দেখা যেত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোর ও তরুণ বয়স মস্তিষ্কের বিকাশ এবং সামাজিক দক্ষতা গঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই বয়সে মানসিক সমস্যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিজীবন ও সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তারা আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও সংকোচ কিছুটা কমেছে, ফলে এখন মানুষ আগের তুলনায় চিকিৎসা নিতে বেশি আগ্রহী। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের গড় আয়ু বাড়াও এই পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকিসহ নানা কারণ বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
গবেষকদের মতে, মানসিক সমস্যার হার দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা হয়নি। তাই বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।