মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও নতুন উত্তেজনা ও কূটনৈতিক মেরুকরণের আভাস দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে চীন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সার্বভৌম অবস্থানকে তারা সম্মান ও সমর্থন করে। একইসঙ্গে বেইজিং পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত এবং তারা এখনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
চীনের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি কূটনৈতিক বিবৃতি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নেতৃত্বাধীন নতুন আঞ্চলিক কাঠামোর বিপরীতে বিকল্প শক্তি-জোট গঠনের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণে সক্রিয় এবং আরও মুসলিম দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উৎসাহ দিচ্ছে, তখন চীনের এই অবস্থান নতুন ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেইজিংয়ের বক্তব্যে বলা হয়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, যারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বাস্তবতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো বাহ্যিক চাপ বা আন্তর্জাতিক জোটের বাধ্যবাধকতায় তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলেও ইঙ্গিত দেয় চীন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই আব্রাহাম অ্যাকর্ডস থেকে দূরে রয়েছে। সৌদি আরবও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেনি এবং বারবার বলেছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া পূর্ণ স্বীকৃতির প্রশ্ন আসবে না। এই প্রেক্ষাপটে চীনের সমর্থন রিয়াদ ও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সক্রিয়তা এখন আর কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বা জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বেইজিং ধীরে ধীরে নিজেকে একটি বিকল্প বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যারা পশ্চিমা বলয়ের বাইরে নতুন রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ গড়ে তুলতে চায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে চীনের পুনরায় প্রকাশ্য অবস্থান মুসলিম বিশ্বের জনমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় তা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের প্রভাব আরও বাড়াতে পারে। একইসঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আব্রাহাম অ্যাকর্ডস শুধু একটি কূটনৈতিক চুক্তি নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে চীনের সাম্প্রতিক অবস্থান ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।