মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এই অঞ্চল কি শান্তির পথে এগোবে, নাকি অব্যাহত সংঘাত ও আধিপত্যবাদের শিকার হয়ে আরও অস্থিতিশীল হবে? অনেক বিশ্লেষকের মতে, আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসন এবং তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন। ফিলিস্তিনে দীর্ঘ দখলদারিত্ব, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে ধারাবাহিক হামলা, এবং আঞ্চলিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে গোটা অঞ্চল এক স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে পড়ে গেছে।
লেবানন প্রসঙ্গও এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নয়। সমালোচকদের মতে, ইসরাইল এমন এক মধ্যপ্রাচ্য চায় যেখানে আরব রাষ্ট্রগুলো দুর্বল, বিভক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর থাকবে। ফিলিস্তিনের পর লেবাননসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের যে আশঙ্কা বহুদিন ধরে আলোচিত, তা এখন আর কেবল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ভূখণ্ড সম্প্রসারণবাদ বহু সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলার “Lebensraum” বা “জীবনধারণের জন্য অতিরিক্ত ভূখণ্ড” তত্ত্ব সামনে এনে পূর্ব ইউরোপ দখলের নৈতিক বৈধতা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। সেই ধারণা থেকেই পোল্যান্ড, ইউক্রেন ও সোভিয়েত ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানো হয়। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যে অনেকে ইসরাইলের চরম ডানপন্থী রাজনীতির মধ্যে সেই ধরনের সম্প্রসারণবাদী মানসিকতার প্রতিফলন দেখতে পান।
বিশেষ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কিছু কট্টরপন্থী মন্ত্রী— যেমন ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচ— ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর অবস্থান এবং “ঐতিহাসিক ইসরাইল” ধারণাকে সামনে এনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, এ ধরনের রাজনীতি আরব জনগণের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই নীতিকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মার্কিন রাজনীতির একাংশের বিরুদ্ধেও। কিছু মার্কিন রাজনীতিবিদ প্রকাশ্যেই ইসরাইলপন্থী অবস্থান নিয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলে বহু মানুষ মনে করেন, ওয়াশিংটনের নীতিতে ভারসাম্যের অভাব রয়েছে এবং ফিলিস্তিনি প্রশ্নে ন্যায়ভিত্তিক সমাধান দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত বোঝাপড়া মধ্যপ্রাচ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। এই দুই রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তির দিক থেকেই নয়, বরং ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণেও পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
একই সঙ্গে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মতো দেশগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা ফিলিস্তিন প্রশ্নের ন্যায্য সমাধান ছাড়া আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণ বা তথাকথিত শান্তিচুক্তিকে পূর্ণ সমর্থন দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
বাস্তবতা হলো— ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত কঠিন। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি কার্যকর ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই হতে পারে ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি। অনেকেই দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে অসম্ভব বলে মনে করলেও, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে। আঞ্চলিক প্রতিরোধশক্তি বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেই, এবং বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থনও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দুই-রাষ্ট্র সমাধান এখন কেবল কূটনৈতিক স্লোগান নয়; বরং তা ভবিষ্যতের একটি বাস্তব রাজনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবেও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।