ইরানের আকাশসীমায় সামরিক অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে জানান, যুদ্ধকালীন মিশন শেষে বিমানটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি ঘাঁটিতে নিরাপদে অবতরণ করে এবং পাইলট বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছেন। তবে কীভাবে বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরান প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন স্টেলথ যুদ্ধবিমানকে সফলভাবে শনাক্ত করে আঘাত করতে পেরেছে। এতে স্টেলথ প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা দেশের মধ্যাঞ্চলের আকাশে একটি শত্রু বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। যদিও তারা নির্দিষ্ট করে বিমানটির ধরন উল্লেখ করেনি।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিনের তৈরি একটি পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার জেট। এর বিশেষ নকশা, রাডার শোষণকারী উপাদান এবং অভ্যন্তরীণ অস্ত্র বহন ব্যবস্থার কারণে এটি রাডারে খুব কম ধরা পড়ে। ফলে শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন পরিচালনায় এটি বিশেষভাবে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার পেছনে ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড (ইও/আইআর) প্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে। চীনের সামরিক বিশ্লেষক ইউ গ্যাং মনে করেন, এ ধরনের সেন্সরের মাধ্যমে বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ শনাক্ত করা সম্ভব, যা স্টেলথ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
তার মতে, যদি বিমানটি রাডার-নির্দেশিত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পড়ত, তবে সেটি ফিরে আসতে পারত না। তাই ধারণা করা হচ্ছে, অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী ইনফ্রারেড-নির্দেশিত কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
ইরান অতীতে রাশিয়া থেকে আর-২৭ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পরিবর্তন করে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টেলথ প্রযুক্তি মূলত রাডার এড়িয়ে চলার জন্য তৈরি হলেও ইনফ্রারেড সিগনেচার পুরোপুরি লুকানো সম্ভব নয়। ফলে আধুনিক যুদ্ধে বিকল্প শনাক্তকরণ প্রযুক্তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষক সং ঝংপিং বলেন, প্যাসিভ সেন্সর ব্যবস্থার বড় সুবিধা হলো—এগুলো কোনো সংকেত নির্গত করে না, ফলে এগুলো শনাক্ত করাও কঠিন। এ কারণে এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতের যুদ্ধ কৌশলে বড় ভূমিকা রাখবে।
২০১৮ সালে কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো সংঘাতে এফ-৩৫ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর সামনে এলো। এর আগে এ ধরনের কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কিছু ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, একাধিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এছাড়া কিছু ট্যাংকার বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আগুনে কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বিমান বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা কঠিন বুঝেই ইরান বিকল্প কৌশল হিসেবে ইনফ্রারেড-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করেছে।
অন্যদিকে, চীনও স্টেলথ প্রযুক্তির মোকাবিলায় উন্নত রাডার ও বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এসব রাডার বিভিন্ন কোণ থেকে সংকেত বিশ্লেষণ করে কম দৃশ্যমান লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম।
সামগ্রিকভাবে, এই ঘটনা আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে—স্টেলথ মানেই অদৃশ্য নয়, বরং এটি একটি সীমিত সুবিধা, যা উন্নত সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।