ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ন্যাটোবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আরও দুই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা, ফলে ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে সেই তালিকা; তবে প্রশ্ন থেকে যায়—ন্যাটোর ‘গুরু’ মহাক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি কি সত্যিই এই জোট ছাড়ার ক্ষমতা রাখেন? গত ২ এপ্রিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম The Guardian-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১ এপ্রিল মার্কিন সিনেটের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ উপকমিটির সদস্য রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল ও ডেমোক্র্যাট নেতা ক্রিস কুনস ট্রাম্পের ন্যাটো-মন্তব্য নিয়ে যৌথ বিবৃতি দেন, যেখানে তারা বলেন—আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিনদের পাশে থেকে ন্যাটোর সেনারা যুদ্ধ করেছে, জীবন দিয়েছে, তাই তাদের অতীত ও ভবিষ্যতের আত্মত্যাগকে হালকাভাবে দেখা যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয়; তাদের মতে, ন্যাটো নিয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের হলেও জোট শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে মার্কিনিরাই বেশি নিরাপদ থাকবে এবং মিত্রদের সঙ্গে এই ঐক্য রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। একই সুরে আরও অনেক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল এবং এই জোটের অবদান অস্বীকার করা যায় না; তাদের মতে, কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি যদি ন্যাটো থেকে সরে যান, তবে তা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্যে, ট্রাম্পের বক্তব্যে স্থিরতা কম, কারণ তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেন; তবে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন এবং এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই সামরিক জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে—এই হুমকি কি শুধুই কৌশলগত চাপ সৃষ্টি, নাকি তিনি সত্যিই নতুন এক বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছেন? ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান ইস্যুতে বা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকটে ইউরোপীয় দেশগুলো যথেষ্ট সহায়তা দিচ্ছে না, অর্থাৎ ইউরোপ সমস্যায় পড়লে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সমস্যায় পড়লে ন্যাটো একইভাবে পাশে দাঁড়ায় না। পশ্চিমা সমরবিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই মনোভাবকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য ‘চরম ধাক্কা’ হিসেবে দেখছেন; কারণ ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত শীতল যুদ্ধের সময় ন্যাটো পশ্চিমা জোটের প্রধান নিরাপত্তা স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে এবং আজও এটি পরমাণু শক্তিধর একাধিক দেশের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী জোট, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশ রয়েছে এবং ইউরোপজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি শত্রুপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখার বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চুক্তি করতে সিনেটের সঙ্গে পরামর্শ করতে বাধ্য হলেও চুক্তি থেকে বের হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই; ১৯৪৯ সালের ন্যাটো চুক্তির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্র চাইলে এক বছরের নোটিশ দিয়ে জোট ছাড়তে পারে এবং তা যুক্তরাষ্ট্র সরকার অন্য সদস্যদের জানায়। অতীতে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ‘ওপেন স্কাইস’ চুক্তির মতো কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, যা নতুন বিতর্ক তৈরি করে। সাবেক ন্যাটো রাষ্ট্রদূত ইভো দালদার মনে করেন, প্রয়োজনে ট্রাম্প বিদেশে থাকা মার্কিন সেনা ও কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যদিও বাস্তবে তা জটিল রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। ন্যাটোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত প্রভাব মোকাবিলা, ইউরোপে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক ঐক্য জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল এই জোট গঠিত হয়, যা বর্তমানে ৩২ সদস্যের শক্তিশালী সামরিক জোটে পরিণত হয়েছে এবং এর বহুল আলোচিত ‘আর্টিকেল ফাইভ’ অনুযায়ী কোনো সদস্যের ওপর হামলা মানে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। এখনো পর্যন্ত কোনো দেশ ন্যাটো ছাড়েনি, কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো কেন্দ্রীয় শক্তি নিজেই বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়, তাহলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে; তবে সেই সম্ভাবনার বাস্তব উত্তর ভবিষ্যতের ওপরই নির্ভর করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিতে পারবেন? বিতর্ক তুঙ্গে
Oplus_131072
You Might Also Like
Sign Up For Daily Newsletter
Be keep up! Get the latest breaking news delivered straight to your inbox.
[mc4wp_form]
By signing up, you agree to our Terms of Use and acknowledge the data practices in our Privacy Policy. You may unsubscribe at any time.
Create an Amazing Newspaper
Discover thousands of options, easy to customize layouts, one-click to import demo and much more.
Learn More